মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | ২৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

Advertise with us
Advertise with us

‘যত দ্রুত সম্ভব’ ৬৬৬ কোটি টাকার বকেয়া কর আদায়ের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

‘যত দ্রুত সম্ভব’ ৬৬৬ কোটি টাকার বকেয়া কর আদায়ের নির্দেশ

পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচটি করবর্ষের বিপরীতে ৬৬৬ কোটি টাকা প্রদেয় কর দাবি ঘিরে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে সোমবার (১২ অক্টোবর) রায় দুটি প্রকাশ করা হয়। দুটি রিটের একটিতে দেওয়া রায় ১৫ পৃষ্ঠার ও অপরটি ৩২ পৃষ্ঠার। গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় দেন।

৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষাংশে আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব রিট আবেদনকারীর (গ্রামীণ কল্যাণ) কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষাংশে আবেদনকারীর বকেয়া কর সংক্রান্ত বিষয়ে নোটিশ জারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।

পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭—এসব করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় কর দাবি ঘিরে মূলত গ্রামীণ কল্যাণ ওই দুটি রিট করে।

আইনজীবীদের সূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটা চুক্তি হয়। এ অনুসারে গ্রামীণ ফোনে বিনিয়োগ করা হয়। চুক্তির আওতায় শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাবে গ্রামীণ কল্যাণ। গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ লভ্যাংশ পায়। তবে যে অর্থ পেয়েছে, তা লভ্যাংশ আয়—নাকি ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কর কর্তৃপক্ষের মতে, ওই অর্থ প্রকৃতপক্ষে সুদ বা বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্ত আয় এবং এটি লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য না করে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর আগে ওই রিট দুটি খারিজ করে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্টের অপর একটি দ্বৈত বেঞ্চ। অবশ্য ওই বছরের ২৯ আগস্ট তা প্রত্যাহার করে নেন একই বেঞ্চ। কারণ হিসেবে বলা হয়, দ্বৈত বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক এক সময় এসব মামলায় সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। যেহেতু তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সুতরাং রায়টি ডিফেকটিভ (ক্রটিপূর্ণ) হবে। পাশাপাশি মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতি গত ১৩ মে এক আদেশে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে পাঠান। এর ধারাবাহিকতায় শুনানি হয়।

আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আবদুল্লাহ আল মামুন ও সরদার জিন্নাত আলী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ।

যে কারণে রিট খারিজ
চুক্তি অনুসারে গ্রামীণ কল্যাণ থেকে গ্রামীণ টেলিকম কিছু টাকা বিনিয়োগ, ঋণ কিংবা আর্থিক সহায়তা হিসেবে গ্রহণ করে বলে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ। তিনি বলেন, চুক্তি অনুসারে ওই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। এর বিপরীতে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাবে গ্রামীণ কল্যাণ। এ ক্ষেত্রে কার ওপর কর আরোপ হবে এবং কী হারে কর আরোপ হবে তা নিয়েই মূলত রিটগুলো। দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি আইনে দুটি কোম্পনি পৃথক আইনগত স্বত্ত্বা। তাই আয়করও পৃথকভাবে দিতে হবে।

আয়কর অধ্যাদেশের ১২০(১) ধারা অনুযায়ী অধস্তন কর্তৃপক্ষ—অর্থাৎ উপকর কমিশনারের (ডিসিটি) দেওয়া কোনো ভুল আদেশ সংশোধন করার ক্ষমতা পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারকে দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান আবদুস সামাদ আজাদ। রায়ের বিষয়ে বলেন, এ সংক্রান্ত শুনানিতে অংশ নিতে আবেদনকারীকে (গ্রামীণ কল্যাণ) যথাযথভাবে নোটিশও দেওয়া হয়। শুনানি নিয়ে পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনার সিদ্ধান্ত দেন যে, গ্রামীণ কল্যাণের দাবি করা ডিভিডেন্ড ইনকামকে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে গণ্য করে করাদেশ দেন। ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে তা নিষ্পত্তি করেন। যথাযথভাবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, গ্রামীণফোনে বিনিয়োগের সূত্রে আয়ের ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ অংশের বিপরীতে আবেদনকারী যে মুনাফা পেয়েছে, তা লভ্যাংশ আয় নয়; বরং অন্যান্য উৎস থেকে আয়।

ওই আয়ের বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে উৎসে কর কাটা হয়নি এবং গ্রামীণ কল্যাণের নামে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসেছে বলে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, আয়কে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে গণ্য করে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বেআইনি নয়। যে কারণে অধ্যাদেশের ১২০ ধারায় শুরু করা কার্যক্রমও বৈধ বলে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে গ্রামীণ কল্যাণ কর কমিশনারের কাছে রিভিশন আবেদন করে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(খ) ধারায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী রিভিশন (পুনর্বিবেচনা) মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে গ্রামীণ কল্যাণ স্বীকৃত করদায় পরিশোধ না করায় তাদের করা পুনর্বিবেচনা আবেদনও খারিজ হয়। মূলত এসব দিক উল্লেখ করে হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ (রিট খারিজ) করে দিয়েছেন।

রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর উপ করকমিশনার পাঁচটি করবর্ষের জন্য বকেয়া করবাবদ ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য আইন অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ওপর নোটিশ ইস্যু করবে বলে জানান আবদুস সামাদ আজাদ। রাষ্ট্রের এই আইন কর্মকর্তা বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুসারে যত দ্রুত সম্ভব এই নোটিশ ইস্যু করতে হবে।

এদিকে, হাইকোর্টের রায়ের পর পরই, তা স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা আছে। এখন প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করা হবে।

গ্রামীণ কল্যাণের সঙ্গে গ্রামীণ টেলিকমের চুক্তি হয় বলে জানান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, এই চুক্তির অনুসারে গ্রামীণফোনের শেয়ার কেনা হয়। অর্থ দেয় গ্রামীণ কল্যাণ আর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় গ্রামীণ টেলিকমকে। পাশাপাশি এর বিপরীতে লভ্যাংশ ভাগাভাগি করে নেবে গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণ। এভাবে ভাগাভাগি হয়ে ২০০৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চলছিল, যা কর কমিশন পর্যন্ত অনুমোদিত ছিল। গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের যৌথ বিনিয়োগের ফলে লভ্যাংশের বিপরীতে সরকারকে অর্থ দিতে হয়। অগ্রিম কর কাটা হয়, যা গ্রামীণ ফোন কেটেই লভ্যাংশ দিয়েছে। ২০১৭ সালে গ্রামীণ কল্যাণের ওপর কর কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করে এবং বলে যে—এটা (ওই অর্থ) অন্যান্য উৎস থেকে আয়। এটি করযোগ্য। অথচ এর বিপরীতে কর ইতিমধ্যে দেওয়া হয়, যা গ্রামীণ ফোন দিয়েছে। আর গ্রামীণ কল্যাণের অংশ থেকেই এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কথা হচ্ছে যে, গ্রামীণ কল্যাণ ওই কর ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে। তাহলে এ ক্ষেত্রে করদাবি ডাবল ট্যাক্সসেশন হয়, যা নিতে পারে না—মূলত এসব যুক্তিতে রিট দুটি করা হয়েছিল।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 ১২
৩৪৫৭৮৯
১০১১১১৩৪১৫১৬
১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৯৩০
৩১ 

ফলো করুন 24todaynews.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রভাষক আফাজুর রহমান চৌধুরী
অফিস