শনিবার ২৭ জুন, ২০২৬ | ১৩ আষাঢ়, ১৪৩৩

Advertise with us
আপডেট
Advertise with us

ভয়ে ঘরছাড়া কুলাউড়ার এক মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্রীর পরিবার!

নিউজ ডেস্ক   |   শনিবার, ০৩ আগস্ট ২০১৯   |   প্রিন্ট   |   ৮২১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ভয়ে ঘরছাড়া কুলাউড়ার এক মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্রীর পরিবার!

গত ৩০ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের চাউরুলী জামেয়া সুন্নিয়া মাদরাসার ৮ম শ্রেণির ছাত্রী হাজেরা বেগমকে (১৪) কুপিয়ে জখম করে প্রতিবেশী রুহুল আমিন। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবা সৈয়দুর রহমান বাদী কুলাউড়া থানায় মামলা দায়ের করলে রুহুল আমিনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

গত ৮ জুলাই জামিনে মুক্ত হন রুহুল। এরপর থেকেই ওই ছাত্রীর পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়া করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় দফা হামলার ভয়ে এক মাস ধরে ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকটাই আত্মগোপনে রয়েছে ওই ছাত্রীর পরিবার।

অভিযোগ রয়েছে, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে রুহুল আমিন মামলা তুলে নেয়ার জন্য স্বপরিবারে আবারও ওই ছাত্রীর মাকে ঘরে গিয়ে মারধর করে। দ্বিতীয় দফা হামলার ঘটনায় থানায় মামলা করেন সৈয়দুর রহমানের স্ত্রী ফাতেমা বেগম। তবে পুলিশ দ্বিতীয় দফা হামলার মামলায় রুহুল আমিনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি বলে অভিযোগ করেন ওই ছাত্রীর মা ফাতেমা বেগম ও স্বজনরা। হামলার শিকার আহত ছাত্রী হাজেরা স্বাভাবিকভাবে আবারও পড়াশুনা করতে পারবে কি-না এনিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পুলিশ জানায়, দুই পক্ষই পরস্পরের আত্মীয় এবং পাশাপাশি বাড়িতে থাকে। জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ববিরোধ ও ছাগল বাঁধার জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার টিলাগাঁওয়ের হাজীপুর গ্রামের সৈয়দুর রহমানের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বাড়ির মনাফ মিয়া ও তার পরিবারের লোকজনের বিরোধ রয়েছে। গত ১২ রমজান বিবাদীদের জমিতে ছাগল বাঁধাকে কেন্দ্র করে হামলায় আহত হন সৈয়দুর রহমানের স্ত্রী ফাতেমা বেগম এবং তার বড় মেয়ে ফাহিমা বেগম। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালিকের হস্তক্ষেপে গত ৮ জুন শালিসি বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির আপস নিষ্পত্তি হয়। এরপর গত ৩০ জুন মাদরাসা যাওয়ার পথে হাজেরা বেগমকে পথরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে তারই দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই একই গ্রামের পার্শ্ববর্তী বাড়ির মনাফ মিয়ার ছেলে রুহুল আমিন ওরফে রুপুল।

এ ঘটনায় হাজেরার বাবা সৈয়দুর রহমান বাদী হয়ে থানায় মামলা করলে পুলিশ রুহুলকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করে। গুরুতর আহত হাজেরা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

এদিকে মামলা করায় রুহুলের পরিবার হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করায় ঘরবাড়ি ছেড়ে সৈয়দুর তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। গত ৮ জুলাই জামিনে মুক্ত হন রুহুল। ১৬ জুলাই সকাল ৯টার দিকে হাজেরার মা ফাতেমা বেগম সন্তানদের স্কুলের বই নিতে আসেন বাড়িতে। এ সময় তার ৭ বছরের ছোট ছেলে সঙ্গে ছিল। বাড়ির সামনে আসার পর রুহুল ও তার বাবা মনাফ মিয়াসহ পরিবারের লোকজন একত্রিত হয়ে ফাতেমা বেগমের ওপর হামলা চালায়। পরে তিনি দৌঁড়ে গিয়ে নিজ ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা চালান। এ সময় রুহুল ও তার পরিবারের লোকজন ঘরের পেছনের দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ওই ছাত্রীর মাকে মারধর করে। পরে তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা পাশের চাউলউরী গ্রামে থাকা তার (ফাতেমা বেগমের) বোন রহিমা বেগমকে বিষয়টি জানান। রহিমা বেগম এসে ফাতেমাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদরাসাছাত্রী হাজেরার ঘরে তালা মারা। প্রাণনাশের ভয়ে তারা মাসখানেক ধরে ঘরবাড়ি ছাড়া। হাজেরার বাবা-মা ও ছোট ভাই পার্শ্ববর্তী চাউলউরী গ্রামে তার বড় খালা রহিমা বেগমের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং হাজেরার চিকিৎসা শেষে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নে তার ছোট খালার বাড়িতে রয়েছেন। স্থানীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় রহিমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় হাজেরার মা ফাতেমা বেগমের সঙ্গে।

ফাতেমা বেগম বলেন, বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে বের হতে গেলে আমাদের প্রায় সময় বাধা ও হুমকি দিতেন মনাফ মিয়া, তার ছেলে রুহুল আমিনসহ তাদের পরিবারের লোকজন। রমজান মাসে ছাগল তাদের জমিতে যাওয়ায় মনাফ মিয়া ও রুহুলসহ সবাই আমিসহ আমার বড় মেয়ে ফাহিমার ওপর হামালা চালিয়। পরে আমরা মৌলভীবাজার সদর হাসপতাল ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে আসি। ঈদের পরে চেয়ারম্যান ও মেম্বার বিষয়টি আপস নিষ্পত্তি করে দেন। এরপরও বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের হুমকি দিতো রুহুল।

জুন মাসের ৩০ তারিখ আমার স্বামী কাজে বাহিরে ছিলেন। আমার ছোট মেয়ে হাজেরা সকালে মাদরাসা যাচ্ছিলো। এ সময় সময় বাড়ির পাশে রাস্তার মধ্যে আগে থেকে ওঁৎ পেতে ছিল রুহুল। আমার মেয়ের রাস্তা আটকে উপর্যুপরি দা দিয়ে কোপাতে থাকে রুহুল। মেয়ের চিৎকার শুনে আমি ও স্থানীয় লোকজন এগিয়ে যাই। রুহুল আমাদের দেখে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েকে প্রথমে কুলাউড়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সেখানেও ডাক্তার তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সিলেট ওসমানী মেডিকেলে পাঠিয়ে দেন।

তিনি বলেন, আমার স্বামী রুহুলকে আসামি করে থানায় মামলা দিলে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম এবং বাড়িতে আমার বড় মেয়ে ও ছোট ছেলে থাকতো। মামলা দেয়ায় রুহুলের বাবা মনাফ মিয়া, চাচা সায়েদ মিয়াসহ সবাই ফোনে ও আমার স্বামী সন্তানকে রুহুলের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নেয়ার জন্য হুমকি দিতে থাকেন। প্রাণের ভয়ে বাড়িতে থাকা আমার স্বামী-সন্তানরা আমার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এরই মধ্যে এক সপ্তাহের মধ্যে জেল থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আসে রুহুল। ঢাকায় চাকরিরত আমার বড় ছেলে আজাদকে সে ফোনে হুমকি দিতে থাকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য। যদি মামলা তুলে না নেই তাহলে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।

মাদরাসাছাত্রী হাজেরা জানায়, কিছুদিন পর আমার মাদরাসার পরীক্ষা। আমি পরীক্ষা দিতে পারব কি-না জানি না। কারণ আমার দুই হাত অনেকটাই অচল। নিজ হাতে ভাত খেতে পারি না। আমার খালা আমাকে খাইয়ে দেন। যেকোন সময় আমাদের ওপর আবার হামালা হতে পারে এ ভয়ে আমি মাদরাসা ও বাড়িতে যেতে পারছি না।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুলাউড়া থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) দিদার উল্ল্যা বলেন, মামলার বাদীরা একেক সময় এক ধরণের বক্তব্য দেন। ছাত্রীর ওপর হামলার ঘটনায় আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগ নিয়েছি। পরে আবার তারা অভিযোগ পরিবর্তন করে। পরবর্তী মামলার অভিযোগ একাধিকবার দিয়েছে। আমরা একাধিক অভিযোগ সংযুক্ত করে নিয়ে মামলা রেকর্ড করেছি। ঘটনার পর আমি তাদেরকে বাড়িতে দিয়ে আসছিলাম কিন্তু তারা মেয়ের চিকিৎসার জন্য বাড়িতে থাকেনি।

কুলাউড়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়ারদৌস হাসান বলেন, এ ব্যাপারে থানায় দুটি মামলা হয়েছে। ওই ছাত্রী ও তার পরিবারকে বাড়িতে নিরাপদে থাকার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রুহুলকে মামলায় অন্তর্ভুক্তি না করার বিষয়ে তিনি বলেন, রুহুল জামিনে মুক্ত হয়েছে কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি। যদি সে ঘটনার আগে জামিনে বের হয়ে আসে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০ 

ফলো করুন 24todaynews.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রভাষক আফাজুর রহমান চৌধুরী
অফিস