চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী

শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ | ১২:১০ পূর্বাহ্ণ | 716

চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী

বাল্যকালে ভারতের গুজরাট রাজ্যের এক রেলস্টেশনে চা বিক্রি করতেন নরেন্দ্র মোদি। তারপর সময়ের আবর্তনে একসময় নাম লেখালেন রাজনীতিতে। গুজরাটের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে ২০১৪ সালে  প্রথমবারের মত ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করা হয়েছিলো। সে মোদীই আবার দ্বিতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক হয়েছিল অনভিজ্ঞ মোদির। তারপর মাত্র ১২ বছরের মাথায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী। তার সহকর্মীদের মতে, যৌবনের শুরু থেকেই লক্ষ্য অর্জনে আপসহীন ছিলেন হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ৬৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।

নতুন ইতিহাস



২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ের খবর জানার পর মায়ের আশীর্বাদ নিচ্ছেন মোদী ছবি রয়টার্স
২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ের খবর জানার পর মায়ের আশীর্বাদ নিচ্ছেন মোদী ছবি রয়টার্স

ভারতের ১৭ তম লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। আর এর মধ্য দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য আবারও দিল্লির মসনদে বসবেন নরেন্দ্র মোদি। এনডিটিভির সরাসরি প্রচারিত তথ্যানুযায়ী, ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৫৪২টির ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। এরমধ্যে বিজেপি ৩৪০ আসন পেয়েছে বিজেপি। বিপরীতে ৯১ আসন পেয়েছে কংগ্রেস। স্বাধীন প্রার্থী কিংবা জোট পেয়েছে ১১০ টি আসন।

ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে হলে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে কমপক্ষে ২৭২টি আসন পেতে হবে কোন রাজনৈতিক দল কিংবা জোটকে। সেই ম্যাজিক নাম্বার বিজেপি খুব দ্রুতই অতিক্রম করে গেল।

আরএসএস থেকে মুখ্যমন্ত্রী

চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী
চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী

১৯৫০ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর গুজরাটের নিম্নবিত্ত এক ঘাঞ্চি পরিবারে মোদীর জন্ম ৷ পারিবারিক নাম নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী৷ ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় মোদী স্কুলজীবনে ছাত্র হিসাবে ছিলেন মাঝারি মানের৷ তবে সেই সময়ই বিতর্ক আর থিয়েটারে ছিল তার প্রবল আগ্রহ, যার প্রভাব তার রাজনৈতিক জীবনেও স্পষ্ট৷

কৈশরে বাবাকে সাহায্য করতে রেল ক্যান্টিনে চা বিক্রি করেছেন মোদী৷ পরে কাজ করেছেন গুজরাট রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির ক্যান্টিনবয় হিসাবে৷ নির্বাচনের আগে তার এই অতীত টেনে এনে কংগ্রেস শিবির থেকে অপপ্রচার চালানো শুরু করলেও মোদীর জন্য তা শাপে বর হয়েছে৷ তার প্রার্থীতাকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়নপত্রে সই করেন এক চাওয়ালা, যা তাকে শ্রমজীবী ভোটারদের নজর কাড়তে সাহায্য করে৷
ঘাঞ্চি সম্প্রদায়ের রীতি অনুযায়ী, ১৭ বছর বয়সেই যশোদাবেন নামের এক বালিকার সঙ্গে বিয়ে হয় মোদীর৷ তার জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সংসার ছিল মাত্র তিন বছরের, শারীরিক সম্পর্কও তাদের ছিল না৷

একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে আট বছর বয়স থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোদী৷  ছাত্র হিসেবে সাদামাটা হলেও মোদী বিতর্কে ছিলেন ওস্তাদ৷ ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর প্রচারক হিসাবে রাজনীতির দরজায় পা রাখেন মোদী৷ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়ার সময়ও তিনি প্রচারক হিসাবে আরএসএস-এর সঙ্গে ছিলেন৷ ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আরএসএস-এ যুক্ত হন, উগ্র সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের কারণে যে সংগঠনটি এ পর্যন্ত তিন দফা নিষিদ্ধ হয়েছে৷ ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ধরপাকড় শুরু করলে আত্মগোপনে যান মোদী৷ এর দশ বছর পর আরএসএস-এর সিদ্ধান্তে ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে কাজ শুরু করেন তিনি৷

১৯৮৫ সালে আরএসএস থেকে বিজেপিতে যোগ দেয়ার ১০ বছরের মাথায় দলের ন্যাশনাল সেক্রেটারির দায়িত্ব পান ১৯৯৫ সালে গুজরাটের নির্বাচনে চমক দেখান মোদী৷  ১৯৯৫ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনে মোদী ছিলেন বিজপির অন্যতম কৌশলপ্রণেতা, তখন তিনি দলের গুজরাট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক৷ সেই সাফল্যের পর অন্যান্য নির্বাচনেও তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯৮ সালে দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান৷

২০০১ সালে কেশুভাই প্যাটেলের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভূত হন নরেন্দ্র মোদী৷ এরপর আরো তিন দফা তিনি ওই পদে বিজয়ী হয়েছেন, গুজরাটকে পরিণত করেছেন উন্নয়নের মডেলে৷

গুজরাটের দাঙ্গা, হিন্দুত্ববাদ

চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী
চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী

২০০২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি গোধরা স্টেশনে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের বহনকারী একটি ট্রেনে আগুন দেয়া হলে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়৷ ওই ঘটনার জন্য মুসলমানদের দায়ী করে গুজরাটে ব্যাপক হামলা, অগ্নসংযোগ চালায় হিন্দুত্ববাদীরা৷ টানা কয়েক দিনের দাঙ্গায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়৷

মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তিনি দাঙ্গায় উসকানি দেন৷ তিনি নিজে কখনো ওই অভিযোগ স্বীকার করেননি৷ আদালতও তাকে অভিযোগ থেকে রেহাই দিয়েছে৷ তবে পরবর্তী সময়ে রাজ্যসভা নির্বাচনে মোদী কার্যত দাঙ্গার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং হিন্দুত্ববাদের ধুঁয়া তুলে ছিনিয়ে নিয়েছেন জয়৷

ওই দাঙ্গার পর ভারত ও ভারতের বাইরে মোদীর ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়৷ যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দিতে অস্বীকার করে এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও তিক্ততা তৈরি হয়৷ এই প্রেক্ষাপটে একজন বিতর্কিত নেতার বদলে উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে কৌশলী প্রচার শুরু করেন তিনি৷

২০০৭ সালের পর তিনি নিজেকে তুলে ধরতে শুরু করেন একজন সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে, প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্র্যান্ড মোদী’৷ আর এই চেষ্টায় তিনি যে পুরোপুরি সফল, তার প্রমাণ ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন।

ভারতের পথে পথে

চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী
চা বিক্রেতা থেকে ইতিহাস গড়লেন মোদী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌঁড়ে নরেন্দ্র মোদী পাড়ি দিয়েছেন তিন লাখ কিলোমিটার পথ৷ সারা ভারতে পাঁচ হাজার ৮২৭টি জনসভায় তিনি অংশ নিয়েছেন, নয় মাসে মুখোমুখি হয়েছেন পাঁচ কোটি মানুষের৷ কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসাবে শুরু করলেও এবার তিনি হিন্দুত্ব নিয়ে প্রচার এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবে, যদিও বাংলাদেশের মানুষ, ভূখণ্ড এবং ধর্ম নিয়ে নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি নেতাদের বক্তব্য নতুন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে৷

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

Development by: webnewsdesign.com