
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | প্রিন্ট | ১৭৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ইউসুফ আহমেদ ইমন, কুলাউড়া:: গোটা দেশটারই বুক চিরে এঁকেবেঁকে বহে চলছে অজস্র নদীনালা ও খালবিল। বর্ষাকালে দেশের সর্বত্রই থইথই করে বানের জল। অপরদিকে শীত মৌসুমে জলঢাকা একই অঞ্চল রূপ ধারণ করে অপরূপ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমিতে। এর মধ্যে অন্যতম হাওর হাকালুকি। দেশের ছোট বড় অন্যান্য হাওরের মতো বৃহত্তম হাওর হাকালুকিও শীতের সময়ে হয়ে ওঠে অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্য। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থাকা এই হাওর প্রতিবছর শীতকালে দূর-দূরান্ত থেকে আগত অসংখ্য পরিযায়ী পাখিদের আকর্ষণ করে। তাদের কিচিরমিচির আর বৈচিত্র্যময় রূপে হাওরের শীতকালীন পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
দল বেঁধে পাখিরা জলাশয়ে নেমে খাবার খুঁজছে। মানুষের সাড়াশব্দ পেলেই তারা ডানা মেলে উড়াল দিচ্ছে। নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির সমাগমে এখন মুখর মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর।
মৌলভীবাজারের জুড়ী, কুলাউড়া ও বড়লেখা এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে হাকালুকি হাওরটি বিস্তৃত।
হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং উত্তর চীন থেকে পাখিরা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে হাকালুকিতে আসে। শীতের সময় এসব অঞ্চলে তীব্র ঠাণ্ডা আর খাদ্যের অভাব থাকায় পাখিরা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ জায়গার সন্ধানে এ অঞ্চলে আসে। হাকালুকির উন্মুক্ত জলরাশি, নলখাগড়া, কচুরিপানা এবং ছোট-বড় অসংখ্য বিল ও চর পাখিদের জন্য আদর্শ আবাসস্থল তৈরি করে।
হাকালুকিতে পাওয়া যায় নানা ধরনের অতিথি পাখি। এর মধ্যে সরালি, চখাচখি, গার্গেনি, তিলিহাঁস, নীলশির, পাতি সরালি, বড় রাজসরালি, বালিহাঁস, শঙ্খচিল, ছোট জিরিয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব পাখিরা দল বেঁধে উড়ে আসে এবং জলাশয়ে খাবার খোঁজে।
হাওরের জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই অতিথি পাখিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের আগমন শুধু হাওরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং স্থানীয় বাস্তুসংস্থানের জন্য উপকারী। তারা জলাশয়ের পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
যদিও হাকালুকি অতিথি পাখিদের জন্য স্বর্গরাজ্য, তবে শিকার ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের টিকে থাকা হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে, শীতকালে পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া জলাভূমির দূষণ এবং অবৈধ দখলও পাখিদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অতিথি পাখি ও হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি, পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও পর্যটকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা পাখি দেখতে পারে এবং হাওরের প্রতি সচেতন হয়।
হাকালুকি হাওরের শীতকালীন সৌন্দর্য ও অতিথি পাখিদের মেলা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। এই অনন্য পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও পরিবেশবিদদের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। যদি সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে হাকালুকি কেবল বাংলাদেশেরই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।
মৌলভীবাজারের পরিবেশগত সংকটাপন্ন হাকালুকি হাওরে জলচর পরিযায়ী পাখির সংখ্যা গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেশি দেখা গেছে। হাওরের বিভিন্ন বিলে সদ্য দুই দিনব্যাপী পাখি শুমারির পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
১৯৯৯ সালে সরকার হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ঘোষণা করে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের একটি প্রতিনিধি দল ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি হাওরের ৪৫টি বিলে এ শুমারি চালায়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর শাহাদাতের নেতৃত্বে আট সদস্যের দল এতে অংশ নেয়। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর ও হাওরের উন্নয়নে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএস (সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্সেস স্টাডিজ) শুমারিতে সহযোগিতা করে।
ওমর শাহাদাত জানান, হাকালুকি দেশের বৃহত্তম হাওর। শুমারিতে হাওরে ৬০ প্রজাতির মোট ৩৫ হাজার ২৬৮টি পাখি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পিংলা বিলে বিশ্বব্যাপী বিপন্ন দুটি বেয়ারের ভূতিহাঁস দেখা যায়। নাগুয়া-লরিবাই বিলে বাংলাদেশে বিরল প্রজাতির একটি বৈকাল তিলিহাঁসেরও দেখা মেলে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাখির সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
হাওরে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওমর শাহাদাত বলেন, পরিবেশের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরূপ প্রভাব, অবাধে মাছ আহরণ এবং কৃষি আবাদে যথেচ্ছ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে এটা ঘটতে পারে। শুমারির সময় বিভিন্ন বিলে মাছ ধরতে দেখা গেছে। কয়েকটি বিল প্রায় পানিশূন্য করে মাছ ধরা হয়েছে।
বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে হাকালুকি হাওরে পাখিশুমারি হয়নি। এর আগে ২০২৩ সালের শুমারিতে এ হাওরে ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮টি, ২০২২ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৬ হাজার ৫০১টি পাখি দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া ২০২০ সালে ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি এবং আগের বছর ২০১৯ সালে ৫১ প্রজাতির পাখি দেখা গিয়েছিল।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলেন, জীববৈচিত্র্যের সরল-সৌন্দর্যে আবহমানকাল থেকে প্রস্ফুটিত দেশের বৃহত্তম এ হাওরকে সর্বপ্রকার ভীতিকর পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে হবে, যাতে অতিথি পাখিরা পূর্বের ন্যায় শান্ত ও নিরাপদ একটি অভয়াশ্রম হিসেবে কার্যত পেতে পারে। এতে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য বহুলাংশে স্থিতিশীল অবস্থায় বিরাজমান থাকবে, ভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি ও মৎসের জন্য হাকালুকি হাওর হয়ে উঠবে পৃথিবীর অন্যতম সুপ্রসিদ্ধ এক অপরূপ প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম।
