মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর, ২০২৬ | ১৮ কার্তিক, ১৪৩৩

Advertise with us

হারিয়ে গেছে সিলেটের পানের সুদিন, এখন খরচই ওঠে না

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

হারিয়ে গেছে সিলেটের পানের সুদিন, এখন খরচই ওঠে না

সিলেটের পাহাড়ি টিলায় ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সঙ্গে অর্থকরী ফসল হিসেবে পান চাষ করে আসছেন খাসিয়ারা। এ চাষ ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন-জীবিকা। খাসিয়ারা নিজেদের ভাষায় পানকে বলেন ‘টেম্পেউ’।

পানের প্রতিটি গুছিতে ফুটে ওঠে খাসিয়া নারীদের হাতের শৈল্পিক নকশা। পান চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন এ অঞ্চলের আদিবাসী খাসিয়ারা।

তবে মৌলভীবাজারে চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কমেছে উৎপাদন, ছোট হয়ে আসছে পান পাতার আকার। অন্যদিকে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের দাম। উৎপাদন কমে যাওয়া ও বাজারে ন্যায্যদাম না পাওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন না চাষীরা, বরং প্রতিদিনের খরচ মেটাতে গিয়ে লোকসানের বোঝা বাড়ছে তাদের।

জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ছোট-বড় ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। এসব এলাকার বন-পাহাড়ের বুকে পান চাষ করা হয়। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহ্য ধরে রেখে যুগ যুগ ধরে জুম চাষের মাধ্যমে এ ধরনের পানের চাষাবাদ করে আসছেন তারা।

খাসিয়া পুরুষরা পানগাছের যত্ন ও পাতা সংগ্রহ করেন। আর নারীরা ঘরের বারান্দায় দলবদ্ধ হয়ে বসে পানগুলো বাজারজাতের জন্য গুছিতে সাজিয়ে তোলেন। ১২টি পান পাতায় একটি গুছি, ১২টি গুছিতে এক কান্তা বা বিড়া হয়। এভাবে ২০ কান্তা বা বিড়ায় হয় এক কুড়ি পান। সময়ভেদে পানের দাম ওঠানামা করে। বর্ষায় প্রতি কুড়ি পান ৫০০-৬০০ টাকা এবং শুকনো মৌসুমে ২-৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এভাবে প্রতি সপ্তাহে একটি খাসিয়া পরিবার দুই-তিন কুড়ি পান বিক্রি করে। তবে পান চাষের জন্য সরকারিভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই বলে জানান তারা। এ ব্যাপারে সরকারি সহযোগিতা কামনা করেন পানচাষীরা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চ পর্যন্ত পান উত্তোলন করা হয় না। এ সময় চাষীরা পানজুমের গাছের পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত থাকেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষাকাল হচ্ছে খাসিয়া পান উৎপাদনের ভরা মৌসুম। সাধারণত একটি গাছ থেকে অন্য সময়ে যে পরিমাণ পান সংগ্রহ করা হয়, বর্ষা মৌসুমে সেই গাছ থেকেই দেড় দুই গুণ বেশি পান পাওয়া যায়। কিন্তু এ বছর আগাম বৃষ্টি হলেও বর্তমানে পান উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। চলতি বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে পান উৎপাদনে। চক্রাকারে একটি গাছ থেকে এক থেকে দেড় মাস পরপর পান সংগ্রহ করা হয়। এবার তা সম্ভব হচ্ছে না। একটি গাছ থেকে পান তুলতে দুই-আড়াই মাস পর্যন্ত বিরতি দিতে হচ্ছে।

চাষীরা জানান, শুধু পান উৎপাদনই কমেনি, পান পাতার আকারও ছোট হচ্ছে। পানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছে না। বাজারে বড় পানের চাহিদা বেশি। পান বড় হলে যে দাম পাওয়া যেত, ছোট পানে সেই দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে একদিকে শ্রমিকের মজুরি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে পানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় পুঞ্জির চাষীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেক পানচাষী স্থানীয় পাইকার-মহাজন ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ঋণে জড়িয়ে পড়ছেন।

চাষীরা আরো জানান, বর্ষার শুরুতে পানজুমের পরিচর্যার জন্য নিরুপায় হয়ে স্থানীয় পাইকারদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা ঋণ নেন অনেকে। এর বিনিময়ে পাইকারদের কাছে কম দামে পান বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া এনজিও থেকে যারা ঋণ নিয়েছেন, তাদের সাপ্তাহিক কিস্তি ও শ্রমিকের বেতন পরিশোধের পর হাতে আর কিছুই থাকছে না।

লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী জানান, পানের রোগবালাইয়ের ধকল কাটিয়ে উঠে এ বছর যে উৎপাদন হয়েছে, তারও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা হতাশ। জিনিসের মূল্য বাড়ছে, পানের দাম কমছে। খাসিয়াদের অবস্থা খুব খারাপ। খাসিয়াদের মূল আয়ই পান থেকে। অনেকে ঋণে জড়িয়ে পড়ছেন। খাসিয়া পান দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও হচ্ছে। সরকারি আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেলে খাসিয়া পানচাষীরা আরো লাভবান হতে পারতেন।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘‌চাষীদের বিভিন্ন সমস্যায় কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আরো কোনো সমস্যা থাকলে সেটাও দেখা হবে।’

সূত্র: বণিক বার্তা

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 ১২৩৪৫
৭৮৯১০১১১১৩
৪১৫১৬১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৯৩০ 

ফলো করুন 24todaynews.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রভাষক আফাজুর রহমান চৌধুরী
অফিস