
নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

আমি ঢাকা সিলেট রেল রুটের সাপ্তাহিক যাত্রী। এই রুটের বাড়তি স্টপেজ কমানোটা খুবই দরকার। বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৃষ্ট স্টপেজে ভোগান্তি বেড়েছে এই রুটের যাত্রীদের। আগে একটা সময় সিলেট বিভাগের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা স্পিকার, মন্ত্রী, এমপিরা রেলযাত্রা উপভোগ করতে রেলপথে গমন-আগমন করতেন। এসব এখন অতীত। কেউ আর দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে রেলে চলতে চান না।
আশার কথা হলো আজ শনিবার (১ আগস্ট) ঢাকা থেকে সিলেটে রেলপথে রওনা হয়েছেন মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তার সঙ্গী হয়েছেন রেল সচিব, রেল প্রকৌশলী’সহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। যাত্রা পথে মন্ত্রী রেল কোচ হিসেবে স্যালুন নয়, এসি (স্নিগ্ধা) সিটকেই বেছে নিয়েছেন। আমার এই ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে উনাদের নজরে বিষয়টি আনার উদ্দেশ্যে কিছু দুর্ভোগের চিত্র লিখেই ফেললাম। প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরাও মন্ত্রীর সামনে বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেন।
সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পথচলায় আমি রেলপথকেই বেশি পছন্দ করি। এজন্য ১০ দিন আগে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে কাটতে হয় রেলযাত্রার টিকেট। আমার না হয় পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে যাত্রা নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু, অন্যান্য যাত্রীদের যাত্রার ১০ দিন আগে আগাম আসা-যাওয়ার টিকিট কেটে রেল চলাচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ কঠিন। তাছাড়া টিকেট ছাড়ার মাত্র ৫ মিনিটে নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায় আগাম সব টিকেট।
আমি যাত্রাপথে প্রায়ই দেখি সিলেটের ‘নিরীহ’ টিকেটকাটা যাত্রীদের দুর্ভোগ নিয়মিতই পোহাতে হয় বিনা টিকেটের কিংবা স্ট্যান্ডিং টিকেটের যাত্রীদের জন্য। অনেক সময় এসি বগিতেও সিটের হাতলে যাত্রীদের গা-ঘেঁষে বসে পড়ে তারা। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এসি বগিতে আসনবিহীন যাত্রী উঠানোর কোন সুযোগ নেই। বৈধ যাত্রী নেহায়েত বাধ্য হয়ে কিছু বললেই অনেক ক্ষেত্রে সঙ্ঘবদ্ধ শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার পর্যন্ত হতে হয়।
এসব উটকো ঝামেলা এড়াতে এসি যাত্রীদের অনেকটা পথ দরজায় তালা দেওয়া শিকলবন্দি সময় পার করতে হয়। এসি বগি তালাবদ্ধ থাকার কারণে বাহিরে থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের ঠেলা-লাথিতে দরজা ভাঙার ঘটনাও আমি যাত্রী হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছি। এদের আটকানোর সাধ্য কী কারোর আছে! তাছাড়া যদি কোন কারণে চলতি ট্রেন যদি অপ্রত্যাশিত অগ্নিকাণ্ড কিংবা দুর্ঘটনায় পতিত হয় তাহলে শেকলবন্দি যাত্রীদের অবস্থা হবে ভয়াবহ।
রেলওয়ের যাত্রীসেবায় সরাসরি নিয়োজিতরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ‘বিনা বেতনের কর্মী’ হওয়াতে তারা চলতি পথের খালি আসন বিক্রিতে মহাব্যস্ত! তাদের নিয়োগকর্তাকেই তারা উল্টো প্রতি আসা-যাওয়ায় বগি বুঝে দিতে হয় ২৫০০-৩০০০ টাকা। অথচ বেসরকারি খাতে সরকারি যাত্রীসেবা ছাড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভালো সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু ঘটেছে এখানে উল্টো।
ঢাকা-সিলেট রুটে ঘণ্টা দুয়েক ট্রেন চলার পর পরিচ্ছন্ন বাথরুম হয়ে উঠে অপরিচ্ছন্ন দুর্গন্ধযুক্ত। এটা দূর করার জন্য ভ্রাম্যমাণ রেল চলাচলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিযুক্ত থাকলেও দায়িত্ব পালন মোটেও চোখে পড়ে না। বাথরুম সাবান, টিস্যু পেপার দেয়ার কথা থাকলেও আমার ৮ বছরের সাপ্তাহিক ঢাকা-সিলেট রুটে ট্রেন চলাচলে কোনদিন এগুলোর ছিটে ফুটেও দেখিনি। এছাড়াও বাথরুম ও দুই বগির মধ্যবর্তী স্থানে গাদাগাদি করে অন্তত ১০/১৫ জন লোক দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ এ যাত্রাপথে।
ঢাকা সিলেট রুটের ৮ ঘণ্টার যাত্রাপথে অন্তত ৪ স্থানে দেখা মেলে হিজড়াদের। তাদের প্রতি দলের জন্য যাত্রী প্রতি বরাদ্দ রাখতে হয় ২০ টাকা। সব মিলিয়ে ৮০ থেকে ১০০ ভাংতি টাকা পকেটে রাখতে হয় তাদের জন্য। মাঝেমধ্যে টাকা সাশ্রয় করতে হিজড়াদের দেখে ৪-৫ মিনিটের জন্য ঘুমের অভিনয়ে সময়টা পার করি। এসির বন্ধ রুমে চানাচুর বিক্রেতা হকারদের হাত ডাক ও কাঁচা পেঁয়াজ, মরিচের কড়া গন্ধে বিরক্তি অসহনীয় হয়ে ওঠে। এছাড়াও অন্যান্য হকার ও ভিক্ষুকের আনাগোনা চলে নিয়মিত। যদিও এসি বগি একদম নির্ঝঞ্ঝাট থাকার কথা।
রেলওয়ে ক্যাটারিং সার্ভিসে নিয়োজিতরাও ‘সেলারি বিহীন’ চাকুরিতে নিয়োজিত। কফি, চিনি, চা পাতা, দুধ, চিপস কিংবা খাবার পানি সবই টার্গেটের দাম ধরা। এর বাইরে নিজেদের আয় তাদের নিজেদেরকেই অর্জন করে নিতে হয়। এর কোন ব্যত্যয় হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নামিয়ে দেয় ওই বগি থেকে। মূলত টার্গেটের খেলায় পড়ে তাদেরকেও ধান্দা করে নিজের উপার্জন বের করতে হয় নিয়মিত। এতে করে সিট বিক্রির মাধ্যমে টু-পাইস ইনকামে জড়িয়ে পরে তারাও।
ঢাকা-সিলেটের রেলপথে ভোগান্তি কমাতে সিলেট বিভাগের মন্ত্রী, এমপিদের মাসে অন্তত একবার হলেও সারপ্রাইজ চলাচল করাটাকে জরুরি মনে করি। এতে করে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করি।
