হাকালুকি হাওরে মাছ উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ শতাংশের বেশি

রবিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২১ | ৪:৪৬ অপরাহ্ণ | 102

হাকালুকি হাওরে মাছ উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ শতাংশের বেশি

টুডে নিউজ ডেস্ক:: মৌসুমের শেষ দিকে এসে হাকালুকি হাওরের বিল-বাদারে ধরা পড়ছে প্রচুর পরিমাণের দেশী প্রজাতির মাছ। ছোট বড় মাছের পাশাপাশি এবছর বিপন্ন প্রজাতির অনেক মাছের আধিক্য দেখা যাচ্ছে হাওরে।

জেলা মৎস্যবিভাগ জানায়, করোনাকালে হাওরে মানুষের চাপ কম থাকায় মাছের স্বাভাবিক প্রজননের সুযোগ আর সরকারি বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে এবছর মাছের উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ ভাগের বেশি।



সরেজমিনে কুলাউড়া উপজেলার চকিয়া বিল ও নাগুয়াসহ কয়েকটি বিলে দেখা যায়, বিলের পাড়ে অস্থায়ী নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করেছেন বিল ইজারাদাররা। সেখানে ভোর থেকে ব্যাবসায়িরা মাছ কেনার জন্য ভীড় করছেন। ইজারাদারদের অধীনে জেলেরা সারাদিন বিলে জাল ফেলে মাছ ধরছেন। কিছুক্ষণ পর পর সেই মাছ নৌকায় করে ঘাটের নিলাম কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

ব্যাবসায়ী ও জেলেরা জানান, এবছর বড় বড় রুই, বোয়াল, আইড়, কমন কার্প, মৃগেল মাছের আধিক্য বেশি। সাথে অন্য জাতের দেশী মাছও ধরা পড়ছে। আর চাপিলা টেংরা মলা চিংড়িসহ বিভিন্ন জাতের ছোট মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ছে। ছোট ও বড় মাছ আলাদা আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে ঘাটে। এবছর বিপন্ন প্রজাতির মাছ পাবদা, চিতল, ফলি, কালিবাউস, গুলশাসহ কিছু মাছ আগের চাইতে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা মাছের অঞ্চলভেদে বিভিন্ন নাম রয়েছে। এরমধ্যে বাতাসি, কাজলি, বাইলা, মলা, ঢেলা, বাটা, পুঁটি, বাইম, রানী, পাবদা, টেংরা, পোয়া, মোয়া, কাকিলা, খলিসা, ছোট চিংড়ি, চান্দা, টাকি, চ্যাং, গুতুম, চ্যাপিলা, ভেদা, তারা, তিতপুঁটি, খোকসা, খরকুটি, দেশি জাতের শিং ও কৈ, দারকিনা, পটকা, কাশ খয়রা, টাটকিনি, গোলসা, রয়না, তেলা টাকি, তারাবাইন ও শালবাইন।

বিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে আছে চিতল, টিলা, খোকশা, অ্যালং, কাশ খাইরা, কালাবাটা, ভাঙন, কালি বাউশ, গনিয়া, ঢেলা, ভোল, পুতুল, গুইজ্যা আইড়, কানি পাবদা, মধু পাবদা, শিলং, চেকা, একঠোঁট্টা, কুমিরের খিল, বিশতারা, নেফতানি, নাপিত কই, ও গজার।

চরম বিপন্ন প্রজাতির মধ্যে আছে ভাঙন, বাটা, নান্দিনা, ঘোড়া মুইখ্যা, সরপুঁটি, মহাশোল, রিটা, ঘাউড়া, বাছা, পাঙ্গাশ, বাঘাইড়, চেনুয়া ও টিলাশোল।

সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে আছে ফলি, বামোশ, টাটকিনি, তিতপুঁটি, আইড়, গুলশা, কাজুলি, গাং মাগুর, কুচিয়া, নামাচান্দা, মেনি ও চ্যাং।

ব্যাবসায়ী আকলুস মিয়া জানান, গতবছর বর্ষায় করোনার কারণে ভাসান পানিতে মাছ ধরতে কম গেছেন জেলেরা। মানুষ কম থাকায় প্রাকৃতিক খাবার পেয়েছে মাছ তাই বড়ও হয়েছে দ্রুত। এজন্য বড় মাছ ধরা পড়ছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘাটে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে।

আলী হোসেন জানান, চকিয়ার বিলে বিশ কেজি ওজনের মাছও ধরা পড়ছে। হাকালুকির মিঠাপানির তাজা ও সুস্বাদু মাছের সুনাম রয়েছে দেশে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও ভালো। তবে ঢাকা সিলেটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখান থেকে মাছ কিনে নেয়ায় কম পুঁজির স্থানীয় ব্যাবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন না।

বিল ইজাদার সাইফুল ইসলাম জানান, এখানে অনেক জাতের মাছ ধরা পড়ে যা অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। তবে যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ার কথা সে পরিমাণ ধরা পড়ছেনা।

সাধারণ মৎস্যজীবীরা অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী হাওরের সরকারি বিলগুলো বিভিন্ন মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু পূজি বিনিয়োগ করেন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। সেক্ষেত্রে সমিতির নিবন্ধিত প্রান্তিক জেলেরা নামেমাত্র খাতা কলমে থাকেন। আয়ের পুরো অংশ যায় পূজি মালিকের ঘরে। কিছু জেলে দিনমজুর হিসেবে মাছ ধরেন। অন্যরা একবারেই বঞ্চিত থাকেন।

জেলা মৎস্য কার্যালয়সূত্র জানায়, প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি হাওরের ৮০ ভাগ মৌলভীবাজারে ও ২০ ভাগ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে ৬০ ভাগ কুলাউড়ায় ১২ ও জুড়ি উপজেলায় ৮ ভাগ রয়েছে। প্রায় ১১২ প্রজাতির মাছের চারণক্ষেত্র হাকালুকি হাওরে ছোট বড় ২৩৮টি বিল রয়েছে। এরমধ্যে মৌলভীবাজার অংশে ২০০টি আর বাকি ৩৮টি বিল রয়েছে সিলেট অংশে। প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে হাওরের পানি কমলে ধরা পড়ে দেশী প্রজাতির মাছ। প্রতিদিন কোটি টাকার মাছ যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

গত কয়েক বছর থেকে বিপন্ন প্রজাতির অনেক মাছ ফিরে এসেছে। এরমধ্যে পাবদা, ফলি, চিতল, আইড়, কালবাউস ও গুলশা এবার বেশি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া রাণী মাছ, কাকিলা, ছোট চিংড়ি, কাজলি, মলা, পুঁটি, টেংরা, পটকা, ভেদা, গনিয়া, কানি পাবদা, মধু পাবদা বেড়েছে। কঠোরভাবে মৎস্য আইন প্রয়োগের ফলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে। প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয় হাকালুকিতে। সরকারি নানা উদ্যোগের ফলে উৎপাদন পাঁচ শতাংশের বেশি মাছ উৎপাদন বেড়েছে। এবছর মার্চ পর্যন্ত হাকালুকির (মৌলভীবাজার অংশে) প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। গত বছর এই সময়ে ছিলো প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক জানান, ২০১৭ সালে বন্যায় এ্যামোনিয়া গ্যাসে হাকালুকি হাওরে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা মায়। সেই ক্ষতি পোষাতে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় ৩০টি বিল নার্সারির (হাওর এলাকার বিল বা পুকুরে পোনা উৎপাদন) মাধ্যমে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় ২৬ লাখ ৪০ হাজার পোনা উৎপাদন করে হাওরে ছাড়া হয়েছিলো। এছাড়া আরো ২৮ লাখ টাকার পোনা মাছ অবমুক্ত করা হয়। যার সুফল এখনো যাওয়া যাচ্ছে।

হাকালুকি ছাড়াও জেলার কাউয়াদিঘী হাইল হাওরসহ ৬ হাওরে এই মৌসুমে ধরা পরে দেশী প্রজাতির মাছ। জেলায় বছরে মাছের চাহিদা ৪৭ হাজার ৩১৩ মেট্রিক টন। হাওর বিল মৎস্যখামার মিলে উৎপাদন হয়েছে ৫০ হাজার ৫১৮ মেট্রিক টন মাছ। বর্তমানে হাকালুকিতে মাছের ১৫টি অভয়াশ্রম রয়েছে। বর্ষায় সেসব অভয়াশ্রম থেকে মাছ ছড়িয়ে পওে পুরো হাওরে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

Development by: webnewsdesign.com