সংসদে প্রধানমন্ত্রী

জিয়া-এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বলা বৈধ নয়

মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১:১৪ অপরাহ্ণ | 38

জিয়া-এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বলা বৈধ নয়
ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, আদালতের রায় অনুযায়ী সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বলা বৈধ নয়। খালেদা জিয়াই এরশাদের ক্ষমতা দখলের পথ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের মৃত্যুতে সংসদের বৈঠকে উত্থাপিত শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিজীবনে এরশাদ ছিলেন অমায়িক, মানুষের প্রতি তার দরদ ছিল।

গতকাল রোববার সংসদের বৈঠকে এ আলোচনায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও তরীকত ফেডারেশনের সদস্যরা অংশ নেন। এ সময় সর্বসম্মতভাবে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরে রেওয়াজ অনুযায়ী চলমান সংসদের সদস্য এরশাদের মৃত্যুতে আজ সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাইকোর্টের  রায় অনুযায়ী জিয়াউর রহমান ও এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকেন না। সেনাশাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে আদালতের রায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরশাদ প্রথমে সামরিক আইন জারি করে নিজেই ক্ষমতা দখল করে নেন। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার পর জিয়া ক্ষমতা দখল করেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদও ক্ষমতা দখল করেন। উচ্চ আদালত এই ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তাই এ দু’জনের কেউই আর রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকেন না। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ?উল্লেখ করা বৈধ নয়। তিনি বলেন, এটা করা যায় না। এই একটা রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারাটা অব্যাহত রাখার একটা সুযোগ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সেই ক্ষমতা দখলের সুযোগটা কিন্তু খালেদা জিয়াই করে দিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি খালেদা জিয়াকে শুধু দুটি বাড়িই নয়, নগদ ১০ লাখ টাকাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। এ কারণে জিয়ার হত্যার ব্যাপারে যে মামলা হয়েছিল, তা বিএনপি চালায়নি। তবে বহু বছর পর ১৯৯১ সালে বা তার পরে খালেদা জিয়া জেনারেল এরশাদকে তার স্বামী হত্যার জন্য দায়ী করেছেন।’

তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে যে যতই কথা বলুন না কেন, জনসমর্থন না থাকলে নির্বাচনে জিতেও কেউ টিকে থাকতে পারে না। তার প্রমাণ ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। তখন খালেদা জিয়া জয়লাভ করেও ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া কখনই গণতান্ত্রিক ধারা মজবুত হয় না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে শুরু করে সকলে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু অংশগ্রহণ করেও তারা এই সংসদকে অবৈধ বা অনেক কিছু বলেও আবার সংসদে এসেছেন। এ জন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদের অংশগ্রহণে বিরোধী দল সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত আছে। তবুও তারা সংসদে বলেন, জনগণ নির্বাচনে ভোট দেয়নি। ভোট না দিলে তারা জনগণকে নিয়ে ১৯৯৬ সালের মতো সরকারকে উৎখাত করতে পারত। কিন্তু জনসমর্থন নেই বলে তারা তা পারছে না।

১৯৯১ সালে বিএনপির শাসনামলে এরশাদের জেলে যাওয়া নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এরশাদ যখন পদত্যাগ করেছিলেন, তাকে গ্রেফতার করে বন্দি রাখা এবং রওশন এরশাদকে বন্দি করে দিনের পর দিন অকথ্য নির্যাতন করেছিল। কারাগারের ভেতরও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে হেয় করা হয়েছে। আমরা তো সেই ধরনের অভদ্র আচরণ করছি না। আমরা যথেষ্ট উদারতা দেখাচ্ছি। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হলেও খালেদা জিয়াকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।’

আওয়ামী লীগ জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের বিরোধিতা করেছিল বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এক মিলিটারি ডিক্টেটর থেকে আরেক মিলিটারি ডিক্টেটর আসুক, সেটা কখনও আমাদের কাম্য ছিল না। এর বিরুদ্ধে আমরাই প্রতিবাদ করেছি। আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।’

সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, জিয়া ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেননি। এরশাদ সেটি করেছিলেন। সাভার স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনারের কাজ এরশাদ শেষ করেছিলেন। ১৪ জন ছাত্রনেতার মৃত্যুপরোয়ানা ছিল, তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন।

সংসদের পক্ষ থেকে এরশাদের ওপর আনা শোক প্রস্তাবে বলা হয়, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৩-১৯৯০ সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে একাধিক সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হন। একনাগাড়ে প্রায় আট বছর ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদ দেশে অসংখ্য উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কর্মকা সাধন করেন। তার মধ্যে যুগান্তকারী কর্মকা হচ্ছে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন, সব মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা, ভূমি সংস্কার, ওষুধ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, পথকলি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা, গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন, পল্লীতে বিদ্যুৎ পৌঁছানো, গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশ ইত্যাদি।

শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ সবার কাছে তার মরহুম স্বামী এরশাদের জন্য দোয়া কামনা করেন। তিনি বলেন, এরশাদ কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা তার মৃত্যুর পরে প্রমাণ হয়েছে; তার সবক’টি জানাজায় মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

আওয়ামী লীগদলীয় সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ‘দোষেগুণে মানুষ। সেগুলো আজ আলোচনা না করাই ভালো। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি।’ সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, তার সঙ্গে আমাদের মত ও পথের ভিন্নতা ছিল। তিনি নরম মনের মানুষ ছিলেন। তখন এত বাজেট ছিল না; তার পরও তিনি অনেক জনহিতকর কাজ করেছেন।

সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জেনারেল এরশাদ জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের আশ্রয় দিয়েছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন। এমনকি একটি তথাকথিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কর্নেল ফারুকের মতো ঘৃণিত খুনিকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী করেছিলেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক।

জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদের তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে সবার কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। ওই সময়ের সব বিরোধী দল তাতে সমর্থন দিয়েছিল। আদালত এরশাদের প্রথম শাসনামলকে অবৈধ বলেছেন, তবে সে সময়ের কর্মকাণ্ড গ্রহণ করেছেন। আর দ্বিতীয় শাসনামল অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনের পরের সময় নিয়ে আদালত নেতিবাচক কিছু বলেননি। কাদের বলেন, এরশাদের কর্মকাশে কাজ করেছেন।

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। এরশাদ আকস্মিক একটি নির্বাচিত সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। আট-নয় বছরের শাসনামলে দুটি নির্বাচন দিয়েছিলেন, যার কোনোটাই স্থায়িত্ব পায়নি। তিনি ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশ না নিয়েও নির্বাচিত হয়েছিলেন, এটা তিনি নিজেই বলেছিলেন।

হারুনের বক্তব্যের জবাবে জাতীয় পার্টির সাংসদ মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ বলেন, ২০১৪ সালে এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়নি। ফলে তিনি নির্বাচন করেননি- এটা সঠিক নয়।

সংসদ চলবে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত :সংসদের বৈঠক শুরুর আগে সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার শিরীন শারমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে এবারের অধিবেশন চলবে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রয়োজনে স্পিকার সময় বাড়াতে পারবেন।

পরে স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম, মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, সাবেক সংসদ সদস্য খালেদা হাবিব এবং আনোয়ারা বেগমের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এ ছাড়া ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অরুণ জেটলি, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আ ন ম শফিকুল হক, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হানিফ, কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর নুরুল ইসলাম, সমাজসেবী ঝর্ণাধারা চৌধুরী, ভাষাসংগ্রামী খালেকুল আল আজাদ, জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়ক আনোয়ারুল কবির শামীমের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে বন্দুকধারীদের হামলায়, সুদানে বন্যায় এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোক প্রকাশ করা হয়।

এন্ড্রু কিশোরের চিকিৎসায় অনুদান প্রধানমন্ত্রীর :বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরকে চিকিৎসার জন্য ১০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে এন্ড্রু কিশোরের কাছে অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কিডনির অসুখে ভুগছেন বরেণ্য এই শিল্পী।

সৌজন্যে:: সমকাল

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

Development by: webnewsdesign.com