রবিবার ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ | ৯ কার্তিক, ১৪৩৩

Advertise with us
আপডেট
কমলগঞ্জের বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি না পেয়েই চলে গেলেন জয়গুন নাহার খানম জামায়াতের বাধায় কবর খুঁড়লেন স্ত্রী-মেয়ে-বোন মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা: হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে প্রাণ গেল দুই তরুণের ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’ বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রভাষক ফাহাদ চৌধুরী জুড়ীতে ছাত্রলীগের মিছিলের পর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কিশোর রায় গ্রেপ্তার চা বাগান থেকে হার্ভার্ডে, ২ কোটি টাকার স্কলারশিপ পেলেন শান্তা যাদব রাশিয়ায় সহস্রাধিক ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের হামলা ‘ইশরাক পিস্তল উঁচিয়ে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছেন, তা ত্রাসের রাজত্ব’ সেই বিকৃত ভিডিও নিয়ে যা বললেন পরীমনি
Advertise with us

কমলগঞ্জের বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি না পেয়েই চলে গেলেন জয়গুন নাহার খানম

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

কমলগঞ্জের বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি না পেয়েই চলে গেলেন জয়গুন নাহার খানম

বীরাঙ্গনা স্বীকৃতির আগেই বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইর দেউল গ্রামের জয়গুন নাহার খানম (৬৮)। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এই বীরঙ্গনা দীর্ঘদিন বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতাজনিত রোগে ভোগে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভোর ৬টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর সংলগ্ন চাতলাপুর চা বাগান এলাকায় পাকিস্তানী হানাদারের ক্যাম্পে বীভৎস নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর পরিবার ও সমাজের নানা কটু কথার শিকারন হওয়া ওই বীরঙ্গনা জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোনো সুযোগ সুবিধা পাননি।

বীরঙ্গনা জয়গুন নাহার খানম এর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে শমমশেরনগর ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, শুক্রবার বিকাল ৫টায় মরহুমার নামাজের জানাযা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইরদেউল গ্রামের বাসিন্দা জয়গুন নাহার এর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ বিকল ছিল। প্রশাসনের কাছে অনেক আবেদন নিবেদন করেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়ে অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়াও সম্ভব হয়নি। দেশের স্বাধীনতার জন্য একজন নারী নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সেই রাষ্ট্র কি তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বও নিতে পারল না?

জানা যায়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা কিংবা চিকিৎসা কোন কিছুই জোটেনি বীরাঙ্গনা জয়গুন নাহার ওরফে জয়গুন বিবির ভাগ্যে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা এই নারী গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুশয্যায় দিন কাটিয়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে যান।

জয়গুন নাহারের স্বামী ছিলেন মৃত সুবেদার লাল খাঁন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল নির্মম নির্যাতন ও দুর্ভোগ। তাঁর একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যাকে পরিবার মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের স্মৃতি বহনকারী সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস হয়ে আজ তিনি অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। রাষ্ট্রের কাছে তাঁর স্বীকৃতি ও সহযোগিতার দাবি থাকলেও কেন এত বছরেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। রাষ্ট্র কি দায় এড়াতে পারে?

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বাজার সংলগ্ন ভাদাইর-দেউল গ্রামের সুঞ্জর খানের মেয়ে জয়গুন স্থানীয় রামচিজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন সবে পঞ্চম শ্রেণিতে পরীক্ষা দিয়েছেন। আনন্দে উল্লাসে ছিল তার শৈশব আবার দেখতেও তিনি সুন্দরী ছিলেন। রাজাকার বাড়ির [বিটি বারী নামে পরিচিত] নেতৃত্বে তখন থমথমে শমশেরনগর। একদিন ভোর বেলা তাকে তুলে নেওয়া হয় শমশেরনগর বন্দি শিবিরে। সেখানে পাকিস্তানি সেনা সুবেদার লালখান, মেজর আজিজ, ক্যাপ্টেন রফিক ও ক্যাপ্টেন দাউদ টানা ছয়মাস পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন জয়গুণ।

যুদ্ধ শেষের দিকে একদিন ক্যাম্প থেকে তিনি প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসেন। কিন্তু ততদিনে জয়গুন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরবর্তীতে নিমসানা আক্তার নামে এক মেয়ের জন্ম দেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নিমসানার বাবার পরিচয় না থাকায় বিপাকে পড়েন তিনি। এরপর কুলাউড়ার শরিফপুর ইউপির লালারচক গ্রামের ভূমিহীন মারুফ আহমদকে বিয়ে দেওয়া হয় জয়গুনের সঙ্গে। যুদ্ধশিশু নিমসানাকে মারুফের পিতৃ পরিচয়ে বিয়ে দেন তিনি।

যুদ্ধশিশুর বাবার পরিচয়ের জন্য যার কাছে বিয়ে দেওয়া হয় সেই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম দেন জয়গুন নাহার। স্বামীও অকালে মারা যান। ৭/৮ বছর আগে একমাত্র ছেলেও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরপারে চলে যান। মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছিলেন।

জয়গুন নাহার খানম জীবিত থাকতে বলেছিলেন, ‘ছোট একটি ঘরে আমাকে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনারা সেই ঘরে আমার ওপর নির্যাতন চালাতো। একটা সময় শুধু রক্ত দেখেছি। মাটিতে পড়ে গেলে ওরা চারজন আমাকে চেপে ধরতো। আমি বাঁচার জন্য চিৎকার করলে একজন বাইরে থেকে কালো আটা জাতীয় রাবার এনে আমার ঠোঁটে-মুখে লাগিয়ে দিতো। এভাবে ছয়মাস সহ্য করেছি।’

তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হই। সেসময় হানাদার বাহিনীর ধারাবাহিক নির্যাতনের কারণে আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাই। আমরা বাড়ি ফিরে দেখি সবকিছু ধ্বংস। আত্মহত্যার জন্য হাতে ইঁদুর মারার ওষুধ নেই। তখন মা-বাবা বলেন ‘তুমি একলা নায়। আরও অনেক মেয়ে আছে।’

‘এদিকে মানুষ বলতে থাকে ‘পেট হইছে’। লজ্জায় ঘরে বসে থাকি। মা বললেন ‘যদি তুমি মর তবে বেহেশত পাইতায় নায়।’ অবশেষে ফাল্গুন মাসে আমার মেয়ের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় নিমসানা আক্তার। এ মেয়ে বড় হতে থাকলে- লোকে বলতে থাকে ‘লালখানের পুড়ি’। তখন কতো মানুষ যে আমাকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করেছে তা বলে শেষ করা যাবে না।’

জয়গুন নাহার আরও বলেছিলেন, ‘আমার এখন থাকার মতো একটি ভিটে নেই। অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে আছি। এ অবস্থায় হয়তো চলে যাব পরপারে। কিন্তু মরার আগে আমি চাই রাষ্ট্র যেন আমাকে স্বীকৃতি দেয়। সমাজের মানুষ আমাকে যেভাবে ঘৃণা করেছে তাদের মুখে কালি দিয়ে যেন আত্মতুষ্টি নিয়ে মরতে পারি।
বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণা করা মৌলভীবাজার টিচার্স ট্রেনিং ইনসটিটিউটের ইন্সট্রাক্টর দীপঙ্কর মোহান্ত বলেন, ‘জয়গুন নাহার খানম এর জীবনী সবার আড়ালেই ছিল। নানা বঞ্চনা নিয়ে তিনি লড়াই করে গেছেন। জীবত থাকাবস্থায় আমি বহু কষ্টে তার কাছে গিয়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পিটিআইতে আমাদের একটি অনুষ্ঠানে তাকে পরিচয় করিয়ে দেই। আমি আশা করেছিলাম রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দিয়ে পরবর্তী জীবনে গর্ব করে বাঁচার অধিকার দিবে। কিন্তু বীরঙ্গনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আগেই তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল কুমার দাস বলেন, জয়গুন নাহার খানম শুধু একজন নারী নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতি আমাদের কাছে অম্লীন হয়ে থাকবে। শেষ জীবনে জয়গুন নাহার নানা রোগে আক্তান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও এই বীরঙ্গনা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়ে একপ্রকার বিনা চিকিৎসাতে মৃত্যুবরণ করায় আমরা গভীরভাবে ব্যথিত।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইর দেউল গ্রামের জয়গুন নাহার খানমের বীরঙ্গনার আবেদন এর বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করনা হবে। তাঁর মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত।

একজন বীরাঙ্গনা যখন চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন, তখন এটি শুধু একটি পরিবারের দুর্দশা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও গভীর লজ্জার বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ নিয়ে আমরা যত কথা বলি, বাস্তবে সেই ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী যদি বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তাহলে আমাদের দায় কোথায়?

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি দাবি বিষয়টি দ্রুত যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কোনো বীরাঙ্গনার জীবন যেন কাগজপত্রের জটিলতা কিংবা অর্থের অভাবে নিভে না যায়।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 ১২
৩৪৫৭৮৯
১০১১১১৩৪১৫১৬
১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৯৩০
৩১ 

ফলো করুন 24todaynews.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রভাষক আফাজুর রহমান চৌধুরী
অফিস