
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

কুলাউড়া উপজেলার বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, সাম্যবাদী দলের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সমাজ-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডা. পবন চন্দ্র দেবনাথের ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী রবিবার (৫ জুলাই) নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে তাঁর নিজ গ্রাম কুলাউড়া উপজেলার বনগাঁও-২ গ্রামে পারিবারিকভাবে স্মরণ, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, কীর্তন ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নিজ গ্রাম ও মফস্বল শহরের গণ্ডি পেরিয়ে ডা. পবন চন্দ্র দেবনাথ এক অনন্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। সাম্যবাদী দলের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি আজীবন শ্রমিক-কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আপসহীন রাজনৈতিক আদর্শ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং শ্রেণিসংগ্রামের চেতনায় তিনি ছিলেন অনন্য।
বক্তারা আরও বলেন, কুলাউড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে তিনি বিপ্লবী চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজ রূপান্তরের দর্শনকে ধারণ করেছিলেন। চীনের কৃষি ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত এই নেতা মানুষের জন্য কেবল পরিবর্তন নয়, বরং সমাজের মৌলিক রূপান্তরের স্বপ্ন দেখতেন।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি মতাদর্শিক জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মেজর (অব.) এম. এ. মোত্তালিব রচিত ‘মুক্তিযুদ্ধের উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গন’ গ্রন্থেও তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নাম উল্লেখ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কমরেড আব্দুল লতিফ, চিকিৎসক মলয় বিশ্বাস, চা-শ্রমিক নেতা কমরেড কৃষ্ণদাস অলমিক, দয়াল অলমিক, দিলীপ কুমার দাস, কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাব টেকনোলজিস্ট সাঈদুর রহমান চৌধুরী, শিক্ষক সুশান্ত কুমার বর্মন, নীলিমা রানী বৈদ্য, জয়রাজ উল্ল্যা, শিমুল মিয়া, মীরা শর্মাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
এ সময় ডা. পবন চন্দ্র দেবনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র ডা. বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ (বাবুল) বাবার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণকারী ডা. পবন চন্দ্র দেবনাথের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে রাউৎগাঁও স্কুলে অধ্যয়নকালে। হিঙ্গাজিয়া গ্রামের বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা ও শিক্ষাবিদ ড. বিজন বিহারী পুরকায়স্থের হাত ধরেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৬২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।
তিনি জানান, রাজনীতির পাশাপাশি ডা. পবন চন্দ্র দেবনাথ দলিল লেখক, সহকারী সরপঞ্চ, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর জীবন মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত ছিল—রাজনীতি, সাংস্কৃতিক ও নাট্যচর্চা এবং হোমিওপ্যাথি গবেষণা ও পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির প্রতিষ্ঠা।
ডা. বাবুল আরও বলেন, ১৯৮৪ সালে সামরিক শাসনামলে ঢাকার গ্রীণ রোডে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি সাম্যবাদী দলের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। এ সময় সরকারি নজরদারির মুখে পড়েন। একপর্যায়ে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) চিকিৎসাধীন ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী বি. এম. আব্বাস এবং কমরেড দিলীপ বড়ুয়ার উদ্যোগে তাঁর চিকিৎসার জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয় এবং সরকারি ব্যয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
দীর্ঘ সংগ্রামী ও কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ১৯৯১ সালের ৫ জুলাই। ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসী গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানান এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
