সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬ | ২৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

Advertise with us
Advertise with us

তারুণ্যের কাছে প্রত্যাশা

  |   বৃহস্পতিবার, ০১ মে ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ১২৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

তারুণ্যের কাছে প্রত্যাশা

তাহলে এখন কী করা দরকার আমাদের? দরকার হলো গোটা ব্যবস্থাটাকে বদলানো। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যা দেওয়ার, তা এরই মধ্যে দিয়ে ফেলেছে, এর পরে সে আর কিছু দিতে পারবে না, ধ্বংস ছাড়া। যাকে আমরা আধুনিক যুগ বলে জানি, সেটি একদিন বের হয়ে এসেছিল সামন্তবাদের অন্ধকার ছিন্ন করে। নতুন যুগের কারিগরদের একজন ছিলেন ফ্রান্সিস বেকন।

তিনি ছিলেন বিজ্ঞানচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ, তাঁর মৃত্যু ঘটে বৈজ্ঞানিক এক অনুসন্ধান পরিচালনা করতে গিয়ে। বরফের সংরক্ষণশীলতা বিষয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন এবং সেই অসুখেই তাঁর মৃত্যু হয়। ফ্রান্সিস বেকন ছিলেন ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ বিচারক এবং ওই পদে থাকাকালেই কিন্তু তিনি উৎকোচ গ্রহণ করেছিলেন। অপরাধটি ধরা পড়ে এবং তিনি শাস্তি পর্যন্ত পান।

শুধু তা-ই নয়, তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে ওই শাস্তি তাঁর প্রাপ্য ছিল। যাকে রেনেসাঁস বলা হয়, আধুনিকতার সেই ধারাপ্রবাহেই পুঁজিবাদের জন্ম এবং পুঁজিবাদের ওই দ্বৈত চেহারা বটে; একদিকে সে জ্ঞানকে মর্যাদা দেয়, অন্যদিকে বেপরোয়া। পুঁজি সংগ্রহ করে পুঁজিবাদ যখন পূর্ণাঙ্গরূপ পরিগ্রহণ করে, তখন তার পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞান-বিজ্ঞান যেমন অভাবিতপূর্ণ উৎকর্ষ অর্জন করতে থাকে, তেমনি এবং ঠিক একইভাবে মুনাফালিপ্সায় উন্মত্ত হয়ে সে মনুষ্যত্ববিনাশী চরম আচরণ শুরু করে। তার ডান হাত যদি হয় জ্ঞানের, তবে বাঁ হাত অর্থলোলুপতার।

পরিণতিতে দেখা গেছে, অর্থেরই জয় হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চলে গেছে অর্থের অধীনে। এরই মধ্যে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার জন্য আধুনিক মানুষ সংগ্রাম করেছে; স্বাধীনতার তবু দেখা পাওয়া গেছে, কিন্তু সাম্য আসেনি, যে জন্য মৈত্রীর পরিবর্তে সংঘাতই প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশের অবস্থান প্রান্তিক পুঁজিবাদী; এখানে পুঁজিবাদের গুণগুলো বিকশিত হয়নি, দোষগুলো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়ার অর্থ তো আত্মসমর্পণ। মানুষ ইতিহাসের মধ্যেই বাস করে, তবে ওই বন্ধনের ভেতরে থেকেও ইতিহাসকে বদলানোর চেষ্টা করে।

এবং ইতিহাস যে বদলায়নি, তা-ও তো নয়। বদলেছে। কিন্তু ব্যক্তির কতটুকু সাধ্য ইতিহাস বদলানোর কাজে লাগে? না, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির জন্য সে সাধ্য মোটেই নেই। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হলে মানুষ শক্তি অর্জন করে বৈকি। যে তারুণ্য ও জ্ঞান নিয়ে কর্মজগতে প্রবেশ করছে, তা নিশ্চয়ই দেশের অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যেককে সচেতন রাখবে। সেই সচেতনতাকে আরো বিকশিত করা এবং তাকে অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া মস্ত বড় একটি কাজ। ব্যবস্থা বদলের জন্য সেটি অত্যাবশ্যকীয়ও বৈকি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার সমাবর্তনগুলোর একটিতে ইংরেজ চ্যান্সেলর মন্তব্য করেছিলেন যে শিক্ষার্থীদের যাকেই তিনি জিজ্ঞেস করেন জীবনের লক্ষ্য কী, সে-ই বলে লক্ষ্য সার্ভিস। সার্ভিস বলতে তারা সরকারি চাকরিই বুঝিয়েছে, সার্ভিসের অন্য অর্থ যে সেবা, সেটি তারা খেয়ালে রাখেনি। যারা গ্র্যাজুয়েট হয়ে কর্মজগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তারা সরকারি চাকরির বদলে বেসরকারি কর্মে যুক্ত হতেই পছন্দ করবে বলে আমাদের ধারণা। অর্থাৎ কিনা চাকুরে নয়, সেবক হতেই চাইবে। সেবাও অবশ্য এখন পরোপকারে উৎসাহী নয়, সে বেচার ও ক্রয়-বিক্রয়ের সমগ্রী হয়ে পড়েছে। শিক্ষা তো ওই পথে আগেই গেছে চলে; চিকিৎসাও একই পথের যাত্রী। তবু এর মধ্যেও সমাজের প্রতি দায়টাকে তরুণরা এগিয়ে নিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা থাকবে। বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে এখন মানববন্ধন হয় এবং হবেও। বড় রকমের একটি মানববন্ধন, প্রত্যক্ষ শুধু নয়, অপ্রত্যক্ষেও গড়ে ওঠা চাই। সেটি হবে সমাজ পরিবর্তনের জন্য। এই যুগে সমাজ পরিবর্তনের মূল দাবিটিই হলো সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা। সামাজিক মালিকানাই পারবে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে, যে গণতন্ত্রের ভিত্তি হওয়া চাই মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং যে সাম্যকে এগিয়ে নেওয়া দরকার মুক্তির অভিমুখে। হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের অগ্রগমন ব্যক্তিমালিকানার অধীনেই ঘটেছে। দাস সমাজ ও সামন্ত সমাজ পার হয়ে বিশ্ব এসেছে অতি উন্নত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, সে ব্যবস্থাও এখন চরম দুর্দশায় নিপতিত। পীড়িত বিশ্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, উন্নতির কোন পথে সে এগোবে? ব্যক্তিমালিকানার, নাকি সামাজিক মালিকানার? ব্যক্তিমালিকানার পথটি কিন্তু প্রতারক; সেটি আসলে উন্নতির নয়, পতনের।

আমরা জানি, পাবলিক সেক্টরের বাইরে প্রাইভেট সেক্টরেই তরুণরা যেতে চাইবে। সে ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কর্মসংস্থান নয়, যদি যৌথ ও সমষ্টিগত উদ্যোগে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব হয়, তবে সেটি হবে সমাজের জন্য একটি উপকারী পদক্ষেপ। কৃষি, শিল্প, মৎস্য, বনায়ন, বহুক্ষেত্রেই সমষ্টিগত উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে। সুযোগের সফল ব্যবহার অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে এবং উৎসও হতে পারে অনুপ্রেরণার। দৃষ্টান্ত ও অনুপ্রেরণা আমাদের সমষ্টিগত অগ্রগতির জন্য উভয়েই অত্যাবশ্যক। সমাজ আশা করে তরুণরা দক্ষ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেটর তো হবেই, হবে সফল সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বও। এবং সর্বদাই খুবই জরুরি প্রয়োজন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির। কাজ না থাকলে অকাজ-কুকাজ বাড়বে, এটি তো স্বাভাবিক। বলার অপেক্ষা রাখে না যে উদ্যোক্তা হওয়াটা অনেক বেশি সম্মানের কর্মচারী হওয়ার তুলনায়।

চীন দেশে একসময় ঘোরতর রাজতন্ত্র কায়েম ছিল। এই রকমের একটি গল্প আছে। একবার এক রাজপুত্র পুকুরে পড়ে যায়। রাজপুত্র সাঁতার জানত না। ওসব কষ্টের কাজ সে শেখেনি। ওদিকে রাজপুত্র পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে দেখে মানুষ স্থির থাকতে পারেনি। তারা ছুটে এসেছে রাজপুত্রকে উদ্ধার করতে। মোটা একটি দড়ি ছুড়ে দিয়ে তারা রাজপুত্রকে বলেছে ওটাকে শক্ত করে ধরতে, যাতে তাকে টেনে তোলা যায়। কিন্তু রাজপুত্র তো কোনো কিছু ধরতে শেখেনি, শিখেছে সে কেবল হাত পেতে নিতে। তাই তার প্রাণ সংশয় দেখা দিয়েছিল। হাত উপুড় করবে এমন ক্ষমতা রাজপুত্রের নেই, যেমন নেই ভিক্ষুকেরও; তারা কেবল নিতেই জানে, দিতে জানে না। কর্মী মানুষ হাত পাতে না, হাতকে কাজে লাগায়।

আমাদের দেশ সম্পর্কে অনেক রকমের রটনার একটি হলো আমরা অলস। রটনাটি মোটেই সত্য নয়। বাংলার কৃষক যে পরিমাণ পরিশ্রম করেন তার তুলনা বিরল। পাট উৎপাদনে এ দেশ যে বিশ্বের সেরা, তার পেছনে কেবল জমি, পানি ও আবহাওয়াই নয়, কৃষকের শ্রমও রয়েছে। অতটা শ্রম অন্য কোনো দেশের মানুষ করতে রাজি হতো কি না সন্দেহ। আমাদের মেয়েরা ঘরে এবং ঘরের বাইরে, এমনকি বিদেশে গিয়েও যেভাবে পরিশ্রম করেন, তা বর্ণনা করা সহজ নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার কিশোর, যুবক, পুরুষ এবং নারী যে একাগ্রতা ও দুঃসাহসের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তার নীরব সাক্ষী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ওই নৃশংস খুনিদের শোচনীয় পরাজয়। বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ বিদেশে গিয়ে যে অমানুষিক পরিশ্রম করেন, তার কারণেই আমাদের অর্থনীতির প্রাণ প্রবহমান। উন্নতি অবশ্যই ঘটেছে। বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন এবং কর্মদক্ষতার দরুন প্রশংসিত হচ্ছেন। বাঙালি মোটেই অলস নয়, তবে তার কর্মের সুযোগ সীমিত এবং তাদের দুঃখটা সেখানেই।

ইহজাগতিকতার ও কর্মোদ্যোগের গুণে গুণান্বিত এই সংস্কৃতিতেই আমরা লালিত-পালিত-বর্ধিত। সংস্কৃতি কিন্তু সভ্যতার চেয়েও শক্তিশালী। তারুণ্যের জ্ঞান, পরিশ্রম ও দক্ষতা এই সংস্কৃতিকেই সমৃদ্ধ করবে এমনটি আশা করা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই তুলনা যথার্থ বটে। গৃহে আমরা মায়ের যত্নে থাকি; বিদ্যালয়ে এসে দ্বিতীয় মাকে পাই, আমাদের যিনি সমাজের সঙ্গে যুক্ত করে দেন, দিশা দেন পথ চলার, সাহায্য করেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। আমাদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। ওদিকে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিন্তু সমাজের চেয়েও অধিক কর্তৃত্বপরায়ণ। মাতৃসম শিক্ষায়তনের সঙ্গে, বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তাই বিরোধ লেগেই থাকে। রাষ্ট্র চায় অনুগত নাগরিক, বিশ্ববিদ্যালয় চায় পরিপূর্ণ মানুষ। এই দ্বন্দ্বে আমাদের সবারই কর্তব্য মাতৃপক্ষকে সমর্থন করা। বিদ্যালয়ের কাছে সব শিক্ষার্থীরই একটা ঋণ থাকে। সেই ঋণ গ্লানির নয়, গৌরবের। আর ওই ঋণ যে পরিশোধ করা সম্ভব, তা-ও নয়। তবে চেষ্টা প্রয়োজন বিদ্যালয়কে আরো বেশি সম্মানিত করার। শিক্ষার্থীরা সেটি করতে পারে নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে। কর্মজীবনে তাদের কাজ যতই সম্মান ও গৌরব অর্জন করবে, বিদ্যালয়ের গৌরব ততই বৃদ্ধি পাবে এবং সেই সঙ্গে বাড়বে তাদের নিজেদের গৌরবও। বস্তুত প্রত্যেকের গৌরব সবার গৌরবের মধ্যেই নিহিত। গৌরব বৃদ্ধির ওই কাজে তরুণদের যে কোনো দ্বিধা থাকবে না, এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

ফলো করুন 24todaynews.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রভাষক আফাজুর রহমান চৌধুরী
অফিস