পুঁজি ছাড়াও উদ্যোক্তা হওয়া যায়

মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২০ | ৮:১৪ অপরাহ্ণ | 251

পুঁজি ছাড়াও উদ্যোক্তা হওয়া যায়

হাই স্কুলে পড়ার সময় একটা বিজ্ঞাপন দেখাতো টিভিতে, যতদূর মনে পড়ে রবির বিজ্ঞাপন ছিল। খুব সম্ভবত উদ্যোক্তা সিম/ উদ্যোক্তা প্যাকেজ এরকম কিছুর বিজ্ঞাপন। তখন প্রথম উদ্যোক্তা শব্দের সাথে পরিচয়। দেশে তখন উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেয়ার একটা আবহ তৈরি হয়েছে মাত্র।
এর পরের বয়সগুলোতে পত্রিকায় যখন বিশ্বের বিভিন্ন ভার্সিটির সমাবর্তনে বক্তাদের দেয়া বক্তৃতাগুলো পড়তাম, খেয়াল করতাম মোটামুটি সবাই-ই গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন কিছু চিন্তা করার কথা বলেন! ‘উদ্যোক্তা হও’, ‘নতুন কিছু করো’, ‘ভিন্ন কিছু করো’, ‘ঝুঁকি নিতে শেখো’- এই কথাগুলো নাড়া দিতো খুব! তারপরই আবার ভাবতাম আমার দ্বারা এসব হবে না, কারণ তখন মাথায় ছিল উদ্যোক্তা হওয়া মানেই অনেক পুঁজির দরকার! আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে যেন by default এটা মাথায় সেট হয়ে থাকে যে Out of Box কিছু চিন্তা করা যাবে না। মফস্বল শহরে তো তা আরো প্রকট! অনিশ্চয়তার ভয় আমাদের এতো প্রকট যে কেউ ঝুঁকি নিতে রাজি হই না! কেউ চিন্তার ক্ষেত্রে Productive হতে চাই না! একজন মানুষ একটা কিছু করে সফল হলে ঐ পথটাই সবাই অনুসরণ করতে চাই!

টিউশনি করতাম, সৌখিন স্বভাবের আমি হাতখরচটা নিজেই চালানোর চেষ্টা করতাম



কয়েক বছর পর যখন স্নাতকে ভর্তি হলাম, তখন টিউশনি করতাম। বরাবরের সৌখিন স্বভাবের আমি নিজের হাতখরচটা নিজেই চালানোর চেষ্টা করতাম। অনার্স লাইফের চার বছরে ক্লাস ফোর থেকে নাইনের স্টুডেন্ট পড়াই। এই অভিজ্ঞতা যে আমার সারা জীবনের জন্য এতো অমূল্য হবে তা তখন বুঝতে পারিনি! স্নাতক শেষ হওয়ার পর যখন শাবিপ্রবি-তে ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা’ কোর্সে ভর্তি হই তখন টিউশনি ছাড়তে হয়। টিউশনি বাদ দেয়ার পর থেকেই মাথায় কুটকুট করছিল কিভাবে অল্প-স্বল্প উপার্জনের ব্যবস্থা করা যায়। দীর্ঘদিন টিউশনি করে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় কিছু না করা মেনে নেয়াটা সহজ ছিল না।

সিলেটে ক্লাস শুরু হওয়ার পর একদম শখের বশেই বেকিং এর একটা কোর্স করি, যেটা করার ইচ্ছা আমার অনেক আগে থেকেই ছিল। কোর্সটা করার পর বাসায় কয়েকদিন কেইক বানাতে বানাতে ভাবতাম সাপ্তাহিক ছুটির যে দুইদিন বাসায় থাকি তখন কেইকের অর্ডার নিতে পারলে মন্দ হয় না। কিন্তু হিসাব-নিকাষ করে দেখতাম যে পরিমাণ খরচ হয় একটা কেইকে, সে টাকা দিয়ে বাজারেই কেইক পাওয়া যায়! শ্রম আর সময়ের কথা নাহয় বাদই দিলাম! দ্বিধায় পড়ে যাই, বেশি দামে কি কেউ কেইক কিনবে এটা ভেবে।

এর মাঝেই একদিন আম্মুর কলিগ পাপড়ি আন্টি একটা কেইকের অর্ডার দিতে চাইলেন। কেইক লাগবে শুক্রবার। ছুটির দিন, স্বাভাবিকভাবেই আমার খুশি তখন দেখে কে! কেইকটা ছিল ফুটবল থিম কেইক। ডেলিভারি দেওয়ার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় অনেকটা। সপ্তাহে ২/৩দিন বাসায় থাকি বলে প্রথমেই ফেইসবুক পেইজ না খুলে নিজের আইডিতে “Baking Story” এলবাম খুলে কাজ শুরু করি। শুরুর দিকে শুধু পরিচিতজনদের অর্ডার রাখতাম। আসলে এটাই আমার ইচ্ছে ছিল, আমার টার্গেট মার্কেট সবাই ছিলেন না। কারণ ক্লাসের জন্য নিয়মিত অর্ডার রাখতে পারতাম না।

একমাসের মধ্যে আমার এক কাজিনের জন্মদিন উপলক্ষে চার পাউন্ড আর দুই পাউন্ডের দুটি কাস্টমাইজড কেইকের অর্ডার পাই। একইদিনে বড় দুটি কাস্টমাইজড কেইক প্রথমবারের মত করাটা সহজ ছিল না মোটেও! বোর্ড ম্যানেজ করতে সীমাহীন টেনশন, কাজের মাঝখানে ক্রিম শেষ হয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে কষ্টটা দারুণ হয়েছিল! কিন্তু ঐ একটা দিন আমার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ।

মাসখানেক পর পুজোর ছুটিতে অবশেষে ফেইসবুকে পেইজ খুলি। পুজোর বন্ধে খুব বেশি কেইক না বানালেও শীতের ছুটি পুরোটাই কাটলো বেকিং এর রাজ্যে! আসক্তি এতোটাই বেড়েছিল যে সেমিস্টার ফাইনালের সময়ও অর্ডার রেখে ফেলতাম। কেইক বানিয়ে দুপুরে সিলেট গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আবার রাতে ফিরে আসতাম।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে MOEF (Moulvibazar Online Entrepreneur Forum) আয়োজিত মেলায় প্রথমবারের মত অফলাইনে আসার সুযোগ হয়। আমার সব ভয় আর আশংকা দূর করে দিয়ে সবগুলো কেইকই সেইল হয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোনো মেলাই বাদ দিই নি, আলহামদুলিল্লাহ সবগুলোতে খুব ভাল রেসপন্স পেয়েছি!
লাস্ট ঈদুল আযহা উপলক্ষে আয়োজিত মেলায় কনফিডেন্স লেভেল এতোটাই Boost Up হয় যে আমার একার উদ্যোগে গত ১-২ অক্টোবর ‘২০১৯ প্রথমবারের মতো “Baking Story Festival” আয়োজন করে ফেলি। দারুণ সফল হই ফেস্টিভালটা আয়োজন করে।

উদ্যোক্তা হিসেবে এই একবছরের জার্নিতে আমি আমার পুরোটা সময় ঢালাওভাবে প্রফেশনে দিতে পারিনি, ইভেন এখনো পারিনা। শুরু থেকেই দু’জেলায় আসা-যাওয়া করে ক্লাস আর বিজনেস মেইনটেইন করা সহজ ছিল না কোনোভাবেই। তবে প্রতিকূলতার বেশিরভাগই মনে হয় শুরুর দিকে কাটিয়ে এসেছি। এখন যেকোনো অবস্থায় ম্যানেজ করটা আগের চেয়ে সহজ লাগে।

আসলে বেকিং এমন একটা প্রফেশন যেখানে অলমোস্ট একই উপাদান নিয়ে কাজ করতে হয় সবগুলো কেইকে, শুধু প্রসেসটা ভিন্ন! আর এ প্রসেসে একটু কিছু ওলট-পালট হলেই সব শেষ! একজন কেইক আর্টিস্টকে যে কি পরিমাণ ধৈর্য সহকারে কাজ করতে হয়, সেটা যাঁরা এই প্রফেশনে আছেন একমাত্র তাঁরা ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।

আমি স্বপ্ন দেখি, ‘Baking Story’ এর আউটলেট হবে একদিন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিমছাম একটা বেকিং স্টুডিও থাকবে আমার! আর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে কিছু লোকের।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

Development by: webnewsdesign.com