রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তির মাস রামাযানকে ভাগ করবেন না

শনিবার, ১৮ মে ২০১৯ | ১১:৫৪ অপরাহ্ণ | 32

রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তির মাস রামাযানকে ভাগ করবেন না

আল্লাহ তাআলা রাহমান, রাহীম। তাঁর দয়া ও অনুকম্পা সর্বত্র ও সর্বদা বিরাজমান। তার রাহমাতের দ্বার সকল বান্দার জন্য সর্বদা খোলা। তাঁর অনুকম্পার বদলেই পৃথিবীতে সকল সৃষ্টির বসবাস। অনুগত অবাধ্য সকলেই তাঁর রাহমান বা পরম দয়ালু বৈশিষ্ট দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। তাঁর পরম দয়ালু গুণের বদৌলতে এক নাস্তিক তাঁকে না মেনেও পৃথিবীতে তাঁরই আলো বাতাস ভোগ করে বসবাস করছে। তাঁর দেয়া জীবিকা ব্যবস্থা থেকে সেও উপকৃত হচ্ছে। তিনি কাউকে তাঁর অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত করছেন না। যদিও আখিরাতে তাঁর দয়া কেবল অনুগত বান্দাদের জন্য বিশেষিত।

আল্লাহ তা’আলার ব্যাপক রাহমাত সর্বত্র ও সর্বদা বিরাজমান হলেও তিনি তাঁর সৃষ্টির জন্য বিশেষ বিশেষ কিছু রাহমাত বিশেষ বিশেষ কাজ ও সময়ের সাথে রেখেছেন। তাঁর বান্দা যখন তাঁর ইবাদাতে মগ্ন হয়, সেই বান্দার প্রতি তিনি বিশেষ অনুকম্পা করে থাকেন। পৃথিবীর মানুষ যদি তাঁর ইবাদাত বন্দেগিতে মগ্ন হয়ে যায় তখন তাঁর দয়া ও অনুকম্পা ব্যাপক হারে তাদের প্রতি অবতীর্ণ হতে থাকে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, আল্লাহ তা’আলার রাহমাত বা অনুকম্পার ভিত্তিতেই মানুষ পার্থিব জীবনের নিআমত ভোগ করে থাকে। পাপ করেও তাওবাহ করলে রাহমাতের ভিত্তিতে মানুষ ক্ষমা পায় এবং রাহমাতের ভিত্তিতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায়।

আল্লাহ তা’আলা তাঁর ব্যাপক রাহমাত সর্বদা সবার জন্য রাখলেও পৃথিবীর বুকে তার নাম ডাক, তাঁর উপাসনা বেশি হলে, মানুষ পাপকর্ম ছেড়ে তাঁর দিকে মনোনিবেশ করলে পৃথিবীতে তাঁর রাহমাতের বার অধিক হারে বর্ষিত হতে থাকে। মানুষ তাঁর প্রতি মনোনিবেশ ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন ও তাকওয়া অর্জনের জন্য বিশেষ বিশেষ সুযোগও তিনি দিয়ে থাকেন।

আল্লাহ তা’আলার বারোটি মাসের মাঝে আমাদের জন্য উপহার দেয়া এমন একটি মাস রামাযান। রামাযান মাসেই তাঁর পবিত্র কালাম কুরআন পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়। রামাযান মাসে বান্দা অধিক ইবাদাতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য তিনি বড় বড় শয়তানদের বন্দী করে রাখেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এই মাসের সম্মানে জান্নাতকে সাজানো হয় এবং জান্নাতের দরজা খোলা রাখা হয়। এই মাসের সম্মানে জাহান্নামের দরজা বন্ধ রাখা হয়। রামাযান মাসের ইবাদত রোযার এতোই ফযিলত যে, এর প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে দিবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সবই আল্লাহর রাহমাতের ফসল। হাদীসে কুদসীতে রয়েছে, আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ রোযা আমার জন্য, স্বয়ং আমি এর প্রতিদান দিবো, বান্দা আমার জন্য তার প্রবৃত্তির কামনা ও পানাহার বর্জন করে।” (বুখারী, হাদীস : ৬৯৩৮)

একজন মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার বর্জন করে কষ্ট করে ক্ষুধার্ত থাকাটা স্বভাবতই আল্লাহ তা‘আলার ভয় ও তাঁর থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশায় হওয়ার কারণে ইবাতটিকে আল্লাহ তা’আলা তার বলে ঘোষণা করেছেন।

অতএব এই মাসে আল্লাহ তা’আলার রাহমাত অন্য মাসের তুলনায় অধিক হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অন্যান্য মাসের যেমন প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ তা‘আলার রাহমাত, মাগফিরাত ও মুক্তির দরজা খোলা; তদ্রুপ এই মাসেরও প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত আল্লাহ তা‘আলার রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তির দরজা খোলা। এই মাসে প্রতিনিয়ত রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তি অন্যান্য মাসের তুলনায় প্রবল আকারে বান্দার দিকে এগিয়ে আসে। বান্দার ইবাদাতের তালিকা যত বর্ধিত হবে রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তি ততোই ব্যাপক হারে বান্দার প্রতি অবতীর্ণ হতে থাকবে।
কিন্তু আমরা এই মাসকে তিন ভাগে ভাগ করে প্রথম দশ দিন রাহমাত, মধ্য দশ দিন মাগফিরাত এবং শেষ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির যে পার্টিশন নির্ণয় করে থাকি, শরীয়তে এর কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বরং রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তি একটি অপরটির সাথে জড়িত।

রাহমাতের বদলেই মানুষ মাগফিরাত ও মুক্তি পায়। প্রথম দশ দিনে রাহমাত শেষ হয়ে গেলে মধ্য দশ দিনে মাগফিরাত পাওয়া সম্ভব নয় এবং শেষ দশ দিনে মুক্তি পাওয়াও সম্ভব নয়। বরং মাসের সর্বদাই রাহমাত রয়েছে। যখন মুমিন বান্দা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মনোনিবেশ করে ক্ষমা ও পরিত্রান চায় তখনই তিনি তাঁর বিশেষ রাহমাতের গুণে তাঁকে ক্ষমা করে দেন।

মূলত আমাদের দেশের মানুষের মাঝে এই ভুলের প্রচলন একটি অনির্ভরযোগ্য হাদীস থেকে জন্ম নিয়েছে। হাদীস শাস্ত্রে জ্ঞানের দুর্বলতার কারণে আমাদের মাঝে এমন আরো অনেক ভুলের প্রচার প্রসার রয়েছে। এখানে আমাদের আলোচনা সর্ব শ্রেণীর পাঠকের উপকারের জন্য; তাই এখানে হাদীসটির শাস্ত্রীয় আলোচনা করে বিষয়টি কঠিন করছি না। কেবল এ কথা বলছি যে, হাদীস শাস্ত্রের সাধারণ জ্ঞান রাখেন অথবা রামাযান মাসকে তিন ভাগে বিভক্তের হাদীসটিকে হাদীস শাস্ত্রের আলোকে অধ্যয়ন করেছেন ব্যক্তি মাত্রই এই হাদীসটি অনির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জানেন।

মোটকথা, হাদীস বা ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন’ বলে আমরা যাই শুনি সবই বাস্তবে রাসূল সা. বলেছেন এমন নয়। সাধারণ পাঠকের জন্য সহজে কেবল এই কথাটি বলতে চাই যে, রাসূলুল্লাহ সা. এর ইন্তিকালের পর বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন স্বার্থে কথা বানিয়ে তা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে চালিয়ে দেয়। এই অবস্থা দেখে রাসূল (সা.) এর প্রকৃত কথা ও দ্বীন সংরক্ষণ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার একদল বিশেষ বান্দা নিজের জীবন বিলিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) নামে বর্ণিত কথাগুলো যাচাই বাছাই ও অনুসন্ধান করে যে কথাটি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বলে পুরো নিশ্চিত বা প্রায় নিশ্চিত হতে পেরেছেন, এই কথাগুলোকে তারা সহীহ বা বিশুদ্ধ অথবা নির্ভরযোগ্য হাদীস বলে চিন্থিত করেছেন। কেউ কেউ নির্ভরযোগ্য হাদীসের কাছাকাছি হাদীসকে হাসান হাদীস হিসেবে আখ্যায়িত করে এটাকেও নির্ভরযোগ্য হাদীসের মতোই বিবেচনা করেছেন। সহীহ বা হাসানের বাহিরে যেসব কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) নামে রয়েছে এগুলো হয় মিথ্যা, অথবা জাল, অথবা রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন বলে কোনো ধরণের নিশ্চয়তা নেই।

যেসব হাদীস রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন বলে নির্ভযোগ্য সুত্রে প্রমাণিত নয় এবং রাসূল (সা.) বলেছেন বলে কোনো নিশ্চয়তা নেই, এমন একটি হাদীস হচ্ছে “রামাযানের প্রথম ভাগ রাহমাতের, দ্বিতীয় ভাগ মাগফিরাতের, তৃতীয় ভাগ জাহান্নাম থেকে মুক্তির।” এই হাদীসটি কেন্দ্র করেই আমাদের মাঝে এই ভুলের প্রসার। হাদীসটির মাঝে অর্থগত আপত্তি না থাকলেও আমরা অনির্ভরযোগ্য এই হাদীসটি রাসূল (সা.) এর কথা হিসেবে ধরতে পারি না এবং এভাবে রামাযানকে ভাগ করতে পারি না। অথচ হাদীসটি অনির্ভযোগ্য হওয়ার সাথে সাথে এতে অর্থগত অনেক আপত্তি রয়েছে যেদিকে উপরে কিছুটা ইঙ্গিত করেছি। অর্থাৎ : পুরো মাসই রাহমাত, মাগফিরাত ও মুক্তির। তাছাড়া মুমিন বান্দার জন্য আল্লাহ রাহমাত, মাগফিরাত, মুক্তি একটির সাথে অপরটি জড়িত। মুমিন বান্দা যদি ক্ষমা ও মুক্তিই না পেলো তবে সে কি রাহমাত পেলো? আর রাহমাত ছাড়া সে ক্ষমা বা মুক্তি পাবে কেমনে? তাছাড়া রামাযানের পুরো মাস রাহমাত, মাগফিরাত ও মুক্তির হলেও শেষ দশকে আল্লাহ তা‘আলার রাহমাত আরো অধিক হারে অবতরণ করে। মহামূল্যবান রাহমাতের রাত কদরের রাত শেষ দশকেই রয়েছে বলে নবী (সা.) জানিয়েছেন। তাই দশ দিন যেতে অনেক জায়গায় যখন এই দুআ করতে শুনা যায় “রাহমাতের দিন বিদায় নিয়েছে” তখন হাসি ও আক্ষেপ লাগে।

তাছাড়াও অনির্ভরযোগ্য এই হাদীসের আলোকে যারা রামাযানকে তিন ভাগে ভাগ করেন, তারা শেষ দশ দিনকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য নির্ধারণ করেছেন। অথচ রাসূলুল্লাহ এর থেকে নির্ভরযোগ্য সুত্রে রামাযান মাসে শয়তান বন্দী সংক্রান্ত হাদীসটিতে রয়েছে, “আল্লাহ তা‘আলা অনেককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, আর এই মুক্তি প্রতি রাতে হয়ে থাকে।” (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, সহীহ ইবনু খুযাইমাহ) যেখানে গ্রহণযোগ্য রামাযানের প্রতি রাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়ার কথা রয়েছে, সেখানে একটি অগ্রহযোগ্য হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমরা কিভাবে মুক্তিকে কেবল শেষ দিনের জন্য নির্ধারণ করি। তাই আসুন, শরীয়ত সম্পর্কে জানি, পড়ি, অধ্যয়ন করি। কুরআন ও সহীহ হাদীসের অধ্যয়ন ও এই দুইয়ের জ্ঞানি ব্যক্তির শরণাপন্নতা আমাকে সঠিক দ্বীন পালনে সহযোগিতা করবে।

লেখক : পরিচালক ও প্রধান মুফতি ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) ফতোয়া গবেষণা ইনস্টিটিউট, সিলেট।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

Development by: webnewsdesign.com